কেন ধনীরা নিজের টাকার বদলে লোন নিয়ে ব্যবসা করেন?
কল্পনা করুন, আপনার এক কোটি টাকা জমানো আছে। আপনি একটি নতুন ব্যবসা শুরু করার সিদ্ধান্ত নিলেন যার জন্য ঠিক এক কোটি টাকাই প্রয়োজন। আপনার প্রথম চিন্তা কী হবে? খুব সম্ভবত, “যাক, আমার কাছে টাকাতো আছেই, ওটা দিয়েই ব্যবসা শুরু করে দিই।”
কিন্তু একজন অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী বা কোটিপতি ঠিক এর উল্টোটা করতে পারেন। তিনি তার নিজের এক কোটি টাকা ব্যাঙ্কে রেখে, ব্যবসা করার জন্য ব্যাঙ্কের কাছেই এক কোটি টাকার লোন চাইতে পারেন।
এই কথা শুনে আপনার মনে হতেই পারে, এটা তো পাগলামি! নিজের টাকা থাকতে কেন ব্যাঙ্কের কাছে গিয়ে ঋণের বোঝা মাথায় নেওয়া? কেন অকারণে সুদ (Interest) দিতে যাওয়া?
এই “পাগলামি”-এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে অর্থ ব্যবস্থাপনার এক গভীর রহস্য। আজকের এই ব্লগে আমরা সেই গোপন কৌশলটিই ভেদ করব এবং দেখব কেন এই পদক্ষেপটি শুধু বুদ্ধিমানের নয়, বরং এটি অনেক বেশি লাভজনকও বটে।
একটি সাধারণ উদাহরণ: ভিডিওর সেই চমকপ্রদ গণিত
উদাহরণটি দিয়েই শুরু করা যাক।
- একজন ব্যবসায়ীর কাছে নগদ ১ কোটি টাকা আছে এবং তার ব্যবসায় ১ কোটি টাকাই বিনিয়োগ করতে হবে।
- নিজের টাকা : তিনি নিজের ১ কোটি টাকা ব্যবসায়ে বিনিয়োগ করলেন।
- ব্যবসায়ী কৌশল: তিনি নিজের ১ কোটি টাকার একটি ফিক্সড ডিপোজিট (FD) করলেন এবং ব্যাঙ্কের কাছ থেকে ১০ বছরের জন্য ১ কোটি টাকার একটি বিজনেস লোন (Business Loan) নিলেন।
ধরুন, এফডি (FD) এবং লোন (Loan)—উভয় ক্ষেত্রেই সুদের হার বার্ষিক ৮%। (বাস্তবে, লোনের সুদের হার সাধারণত এফডি-র চেয়ে বেশি হয়, কিন্তু এই গণিতটি বোঝার জন্য আমরা আপাতত এটিকেই ধরে এগোচ্ছি। এর আসল কারণ আমরা পরে ব্যাখ্যা করব)।
১০ বছর পর কী ঘটবে?
১. লোনের ক্ষেত্রে (খরচ): আপনি যদি ১০ বছরের জন্য ৮% সুদে ১ কোটি টাকার লোন নেন এবং তা EMI (মাসিক কিস্তি) হিসাবে পরিশোধ করেন, তবে আপনাকে মোট পরিশোধ করতে হবে প্রায় ১ কোটি ৪৫ লক্ষ টাকা (প্রায় ৪৫ লক্ষ টাকা সুদ হিসেবে)।
২. এফডি-র ক্ষেত্রে (আয়): আপনি যদি ১ কোটি টাকা ১০ বছরের জন্য ৮% চক্রবৃদ্ধি সুদে (Compounding Interest) এফডি করে রাখেন, তবে ১০ বছর পর সেটির মোট মূল্য দাঁড়াবে প্রায় ২ কোটি ২০ লক্ষ টাকা।
এবার লাভ-ক্ষতির হিসাব দেখুন:
- আপনার এফডি থেকে মোট আয় হলো: ২.২০ কোটি টাকা
- আপনার লোন বাবদ মোট খরচ হলো: ১.৪৫ কোটি টাকা
- আপনার নীট লাভ = ২.২০ কোটি – ১.৪৫ কোটি = ৭৫ লক্ষ টাকা!
অর্থাৎ, নিজের টাকা ব্যবহার না করে ব্যাঙ্কের টাকা ব্যবহার করার ফলে, আপনি কোনো ঝুঁকি ছাড়াই বসে বসে ৭৫ লক্ষ টাকা অতিরিক্ত লাভ করলেন।
এখন আপনার মনে প্রশ্ন আসতেই পারে, দুটোই তো ৮% সুদ, তাহলে এই তফাৎ কেন হলো?
এর কারণ হলো “চক্রবৃদ্ধি সুদ” (Compounding Interest) বনাম “ইএমআই” (EMI)-এর গণিত।
- এফডি (FD): এখানে আপনার সম্পূর্ণ ১ কোটি টাকার ওপর প্রতি বছর ৮% সুদ যোগ হচ্ছে এবং পরের বছর সেই সুদের ওপরও আপনি সুদ পাচ্ছেন (Compound Interest)। তাই টাকাটা রকেটের গতিতে বাড়ে।
- লোন (Loan): এখানে আপনি প্রতি মাসে ইএমআই দিচ্ছেন। প্রতিটি ইএমআই-এর সাথে আপনার আসলের (Principal) পরিমাণও কমতে থাকে। তাই ব্যাঙ্ক শুধুমাত্র কমতে থাকা আসলের ওপরই সুদ চার্জ করে (Reducing Balance)।
এই দুটি ভিন্ন গণনা পদ্ধতির কারণেই একই সুদের হার হলেও ফলাফলে এত বড় পার্থক্য তৈরি হয়।
শুধু গণিত নয়, এর পেছনে আছে আরও ৪টি বড় কারণ
আগের উদাহরণটি খুবই সরলীকৃত। বাস্তবে, এফডি-র সুদ ৮% হলে, বিজনেস লোন ১২-১৪% হতে পারে। তাহলেও কেন ব্যবসায়ীরা লোন নেন? কারণ ওই ৭৫ লক্ষ টাকার “গাণিতিক লাভ” ছাড়াও এর পেছনে আরও অনেক বড় এবং বাস্তবসম্মত কারণ রয়েছে।
১. লিকুইডিটি বা টাকার সহজলভ্যতা (Liquidity is King)
ব্যবসার জগতে একটি কথা খুব প্রচলিত: “ক্যাশ ইজ কিং” (Cash is King) বা লিকুইডিটিই রাজা। একজন ব্যবসায়ীর কাছে তার নিজের নগদ টাকা (বা সহজে নগদে পরিণত করা যায় এমন সম্পদ, যেমন এফডি) হলো তার “সেফটি নেট” বা সুরক্ষা কবচ।
- খারাপ পরিস্থিতি (Worst-Case Scenario): ধরুন, আপনি আপনার সব টাকা (১ কোটি) ব্যবসায় ঢেলে দিলেন এবং দুর্ভাগ্যবশত ব্যবসাটি চলল না বা কোনো বড়সড় আর্থিক বিপর্যয় (যেমন কোভিড বা অর্থনৈতিক মন্দা) এলো। তখন আপনার হাতে আর কোনো টাকাই থাকবে না। আপনি ব্যক্তিগতভাবে দেউলিয়া হয়ে যাবেন।
- স্মার্ট পদক্ষেপ: কিন্তু যদি আপনি লোন নিয়ে ব্যবসা করেন, আর আপনার নিজের ১ কোটি টাকা এফডি করা থাকে, তবে ব্যবসা ফেল করলেও আপনার ব্যক্তিগত জীবনে কোনো আঁচ আসবে না। ভিডিওতে যেমন বলা হয়েছে, সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতেও আপনি ওই এফডি ভেঙে ব্যাঙ্কের লোন শোধ করে দিতে পারবেন। আপনার নিজের মূলধন সুরক্ষিত থাকল।
২. OPM – অন্যের টাকায় খেলা (Using Other People’s Money)
ধনীরা ধনী হন কারণ তারা নিজেদের টাকা দিয়ে কাজ করান না, তারা “অন্যের টাকা” (Other People’s Money বা OPM) দিয়ে কাজ করান। এক্ষেত্রে, “অন্যের টাকা” হলো ব্যাঙ্কের টাকা।
ধরুন, আপনার ব্যবসায় লাভ (Return on Investment) হয় বছরে ১৫%।
- নিজের টাকা: আপনি নিজের ১ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে বছরে ১৫ লক্ষ টাকা লাভ করলেন।
- লোনের টাকা: আপনি ব্যাঙ্ক থেকে ১২% সুদে ১ কোটি টাকা লোন নিলেন। আপনার ব্যবসা ১৫% লাভ করল (১৫ লক্ষ)। আপনি ব্যাঙ্ককে ১২% সুদ দিলেন (১২ লক্ষ)। আপনার নীট লাভ হলো ৩ লক্ষ টাকা।
আপনি বলবেন, “এতে তো লাভ কমে গেল!” কিন্তু আপনি একটা জিনিস ভুলে গেছেন। আপনার নিজের যে ১ কোটি টাকা ছিল, সেটা তো আপনি ব্যবসাই লাগাননি! সেটা তো আপনার ব্যাঙ্কে এফডি করা আছে (ধরুন ৮% সুদে)।
তাহলে আপনার মোট লাভ কত হলো? (ব্যবসা থেকে ৩ লক্ষ) + (এফডি থেকে ৮ লক্ষ) = মোট ১১ লক্ষ টাকা।
আসল খেলাটা অন্য জায়গায়। আপনি যদি নিজের টাকায় ব্যবসা করে ১৫% লাভও করেন, আপনার মূলধন ১ কোটিই থাকল। কিন্তু লোনের ক্ষেত্রে, আপনি আপনার ১ কোটি টাকাকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রেখে, ব্যাঙ্কের ১ কোটি টাকা দিয়েও ব্যবসা চালাচ্ছেন। আপনার ঝুঁকি শূন্যের কাছাকাছি।
৩. ট্যাক্স বাঁচানোর সেরা উপায় (The Tax Shield)
এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ। ব্যবসায়ীরা যখন লোন নেন, তখন সেই লোনের ওপর যে সুদ (Interest) দিতে হয়, সেটিকে “ব্যবসার খরচ” (Business Expense) হিসেবে দেখানো যায়।
- এর মানে কী? ধরুন, আপনার ব্যবসা বছরে ৩০ লক্ষ টাকা লাভ (Profit) করেছে এবং আপনি লোনের সুদ বাবদ ৫ লক্ষ টাকা দিয়েছেন।
- আপনাকে ওই ৩০ লক্ষ টাকার ওপর ট্যাক্স দিতে হবে না।
- আপনার ট্যাক্সযোগ্য লাভ (Taxable Profit) ধরা হবে = (৩০ লক্ষ – ৫ লক্ষ) = ২৫ লক্ষ টাকা।
অর্থাৎ, লোনের সুদ দেওয়ার ফলে আপনার লাভের পরিমাণ কমল ঠিকই, কিন্তু আপনার প্রদেয় ট্যাক্সের পরিমাণও অনেক কমে গেল। আপনি যদি ৩০% ট্যাক্স ব্র্যাকেটে থাকেন, তবে ৫ লক্ষ টাকার ওপর আপনি সরাসরি ১.৫ লক্ষ টাকা ট্যাক্স বাঁচিয়ে ফেললেন।
এই “ট্যাক্স শিল্ড”-এর কারণে আপনার লোনের আসল খরচ (Effective Rate of Interest) অনেকটাই কমে যায়।
৪. ব্যবসার ক্রেডিট স্কোর তৈরি করা (Building Business CIBIL)
আপনার যেমন ব্যক্তিগত CIBIL বা ক্রেডিট স্কোর আছে, তেমনই আপনার ব্যবসারও একটি নিজস্ব ক্রেডিট প্রোফাইল তৈরি হয়।
আপনি যদি আজ ১ কোটি টাকার লোন নিয়ে তা সময়মতো পরিশোধ করেন, তবে আপনি ব্যাঙ্কের কাছে একটি ভালো “ক্রেডিট হিস্ট্রি” তৈরি করলেন। এর ফলে, ৫ বছর পর যখন আপনার ব্যবসাকে বড় করার জন্য (Expansion) ১০ কোটি টাকার লোন প্রয়োজন হবে, ব্যাঙ্ক আপনাকে হাসিমুখে সেই লোন দেবে।
কিন্তু আপনি যদি কখনো লোন না নিয়ে শুধু নিজের টাকাতেই ব্যবসা করেন, তবে ব্যাঙ্কের কাছে আপনার ব্যবসার কোনো “হিস্ট্রি” বা তথ্য থাকবে না। তখন হঠাৎ করে বড় লোনের প্রয়োজন হলে ব্যাঙ্ক আপনাকে বিশ্বাস করতে দ্বিধা বোধ করবে।
উপসংহার: ধনীরা ঋণকে ভয় পায় না, তারা ঋণকে ব্যবহার করে
শেষ কথা হলো, সাধারণ মানুষ এবং ধনীদের মানসিকতায় ঋণ (Debt) নিয়ে একটি মৌলিক পার্থক্য আছে।
- সাধারণ মানুষ: ঋণকে একটি বোঝা বা বিপদ হিসেবে দেখে। তারা EMI-কে ভয় পায়। তারা সাধারণত “খারাপ ঋণ” (Bad Debt) নেয়—যেমন, ফোন কেনার জন্য লোন, ছুটি কাটানোর জন্য লোন, যা থেকে কোনো আয় হয় না।
- ধনী ব্যবসায়ী: ঋণকে একটি “হাতিয়ার” (Tool) বা “লিভারেজ” (Leverage) হিসেবে দেখে। তারা “ভালো ঋণ” (Good Debt) নেয়—অর্থাৎ এমন ঋণ যা তাদের আরও বেশি টাকা আয় করতে সাহায্য করে (যেমন বিজনেস লোন)।
তাই, পরের বার যখন শুনবেন কোনো বড় ব্যবসায়ী হাজার কোটি টাকার লোন নিয়েছেন, তখন এটা ভাববেন না যে তিনি দেউলিয়া হয়ে গেছেন। বরং এটা ভাবুন যে, তিনি হয়তো তার নিজের টাকাকে সুরক্ষিত রেখে, ব্যাঙ্কের টাকা দিয়ে আরও বড় কোনো “খেলা”-এর প্রস্তুতি নিচ্ছেন।







