ধনীরা কেন লোন নেয়? স্মার্ট ক্রেডিট ব্যবহারের গোপন কৌশল যা আপনাকে কেউ শেখায়নি
ছোটবেলা থেকে আমাদের বেশিরভাগ মধ্যবিত্ত পরিবারে একটি কথা শেখানো হয়: “ঋণ হলো একটি অভিশাপ। যত দ্রুত পারো ঋণ শোধ করো এবং ঋণমুক্ত জীবন যাপন করো।”
এই উপদেশটি ভুল নয়, কিন্তু এটি অসম্পূর্ণ।
আপনি যদি বিশ্বের শীর্ষ ধনী ব্যক্তিদের দিকে তাকান—মুকেশ আম্বানি থেকে শুরু করে ইলন মাস্ক, কিংবা রবার্ট কিয়োসাকি—দেখবেন তাদের প্রত্যেকেরই কোটি কোটি টাকার ঋণ বা লোন রয়েছে।
এখন প্রশ্ন হলো, যাদের কাছে ইতিমধ্যেই এত টাকা আছে, তারা কেন লোন নেন? তারা কি বোকা? নাকি তারা এমন কোনো গোপন কৌশল জানেন যা সাধারণ মানুষ জানে না?
উত্তর হলো: ধনীরা লোন এবং ক্রেডিট ব্যবহার করেন টাকা তৈরি করার জন্য, আর সাধারণ মানুষ লোন ব্যবহার করেন টাকা খরচ করার জন্য।
আজকের ব্লগে আমরা সেই গোপন কৌশলগুলো উন্মোচন করব। জানব কীভাবে ধনীরা স্মার্টভাবে ঋণ বা ক্রেডিট ব্যবহার করে তাদের সম্পদ বহুগুণ বাড়িয়ে তোলেন এবং আপনি কীভাবে এই কৌশলগুলো নিজের জীবনে প্রয়োগ করতে পারেন।
অধ্যায় ১: ‘ভালো ঋণ’ বনাম ‘খারাপ ঋণ’ (Good Debt vs. Bad Debt)
স্মার্ট ক্রেডিট ব্যবহারের প্রথম ধাপ হলো এই দুটি ঋণের পার্থক্য বোঝা। ধনীরা শুধুমাত্র ‘ভালো ঋণ’ নেওয়ার ক্ষেত্রে ওস্তাদ।
১. খারাপ ঋণ (Bad Debt): এটি হলো সেই ঋণ যা আপনি এমন জিনিস কেনার জন্য নেন, যার মূল্য সময়ের সাথে সাথে কমে যায় (Depreciating Assets)। এটি আপনার পকেট থেকে টাকা বের করে নেয়।
- উদাহরণ: পার্সোনাল লোন নিয়ে বিয়ে করা, ক্রেডিট কার্ডে ইএমআই করে দামী ফোন কেনা, বা লোন নিয়ে লাক্সারি কার কেনা (যা ভাড়ায় খাটবে না)।
- ফলাফল: আপনি গরীব হতে থাকেন কারণ আপনি সুদের বোঝা টানছেন এমন জিনিসের জন্য যা আপনাকে কোনো আয় দিচ্ছে না।
২. ভালো ঋণ (Good Debt): এটি হলো সেই ঋণ যা আপনি এমন সম্পদ কেনার জন্য নেন, যার মূল্য সময়ের সাথে সাথে বাড়ে বা যা আপনাকে নিয়মিত আয় দেয় (Appreciating/Income-Generating Assets)।
- উদাহরণ: বাড়ি ভাড়া দেওয়ার জন্য হোম লোন নেওয়া, ব্যবসা বাড়ানোর জন্য বিজনেস লোন নেওয়া, বা এমন কোনো যন্ত্র কেনা যা আপনার ব্যবসার উৎপাদন বাড়াবে।
- ফলাফল: এই ঋণের কিস্তি (EMI) আপনার নিজের পকেট থেকে দিতে হয় না; সেই সম্পদ থেকে আসা আয় দিয়েই লোন শোধ হয় এবং বাড়তি লাভ আপনার পকেটে থাকে।
অধ্যায় ২: OPM বা ‘অন্যের টাকায় ধনী হওয়া’ (Leverage)
ধনীদের স্মার্ট লোন ব্যবহারের সবচেয়ে বড় কৌশলটির নাম হলো OPM (Other People’s Money) বা অন্যের টাকা ব্যবহার করা। ব্যাংকের টাকাকে তারা ‘লিভারেজ’ (Leverage) হিসেবে ব্যবহার করেন।
আসুন একটি গাণিতিক উদাহরণ দিয়ে বুঝি।
ধরুন, আপনি ১ কোটি টাকা দিয়ে একটি প্রপার্টি কিনতে চান এবং আশা করছেন এর দাম বছরে ১০% বাড়বে।
দৃশ্যকল্প ১: সাধারণ মানসিকতা (নিজের টাকা) আপনার কাছে ১ কোটি টাকা আছে। আপনি পুরো ১ কোটি টাকা নগদ দিয়ে প্রপার্টিটি কিনলেন।
- ১ বছর পর প্রপার্টির দাম হলো: ১.১০ কোটি টাকা।
- আপনার লাভ: ১০ লক্ষ টাকা।
- আপনার রিটার্ন (ROI): ১০%
দৃশ্যকল্প ২: ধনীদের মানসিকতা (লোন ব্যবহার) আপনি নিজের মাত্র ২০ লক্ষ টাকা দিলেন (Down Payment) এবং বাকি ৮০ লক্ষ টাকা ব্যাংক থেকে লোন নিলেন (ধরি ৮% সুদে)।
- ১ বছর পর প্রপার্টির দাম হলো: ১.১০ কোটি টাকা। (মোট লাভ ১০ লক্ষ)।
- কিন্তু আপনাকে ৮০ লক্ষ টাকার ওপর ৮% সুদ দিতে হয়েছে = ৬.৪ লক্ষ টাকা।
- আপনার নিট লাভ = ১০ লক্ষ (সম্পদের লাভ) – ৬.৪ লক্ষ (সুদ) = ৩.৬ লক্ষ টাকা।
এখন জাদুটা দেখুন: আপনি পকেট থেকে বিনিয়োগ করেছিলেন মাত্র ২০ লক্ষ টাকা। আর আপনার নিট লাভ হয়েছে ৩.৬ লক্ষ টাকা।
- আপনার রিটার্ন (ROI): (৩.৬ / ২০) x ১০০ = ১৮%!
ফলাফল: নিজের টাকা ব্যবহার করে আপনি পেতেন ১০% রিটার্ন, কিন্তু স্মার্টলি লোন ব্যবহার করে (OPM) আপনি পাচ্ছেন ১৮% রিটার্ন। এটাই লিভারেজের শক্তি। ধনীরা কম টাকা খাটিয়ে বেশি সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করেন।
অধ্যায় ৩: ট্যাক্স বাঁচানোর ঢাল (Tax Shield)
লোন নেওয়ার আরেকটি বড় কারণ হলো ট্যাক্স সাশ্রয়। সরকার ব্যবসার প্রসার এবং রিয়েল এস্টেট খাতকে উৎসাহিত করার জন্য ঋণের ওপর বিশাল কর ছাড় দেয়।
ধনীরা জানেন যে, তারা যদি নিজেদের টাকা খরচ করেন তবে তা ‘ট্যাক্স দেওয়ার পরের টাকা’ (Post-tax income)। কিন্তু যদি তারা লোন নেন, তবে সেই লোনের সুদকে তারা ‘খরচ’ (Expense) হিসেবে দেখাতে পারেন, যা তাদের মোট আয়কর কমিয়ে দেয়।
- হোম লোন: হোম লোনের সুদের ওপর সেকশন 24(b) অনুযায়ী ছাড় পাওয়া যায়।
- বিজনেস লোন: ব্যবসার জন্য নেওয়া যেকোনো লোনের সুদকে ‘বিজনেস এক্সপেন্স’ হিসেবে দেখানো যায়। এর ফলে ব্যবসার লাভ কম দেখানো হয় এবং কম ট্যাক্স দিতে হয়।
সরকার মূলত আপনার সম্পদ তৈরির খরচের একটি অংশ ভর্তুকি হিসেবে দিচ্ছে। ধনীরা এই সুযোগটি কখনোই হাতছাড়া করেন না।
অধ্যায় ৪: লিকুইডিটি বা নগদ টাকা ধরে রাখা (Arbitrage)
ধরুন, একজন ধনী ব্যক্তির কাছে নতুন মার্সিডিজ কেনার মতো ১ কোটি টাকা নগদ আছে। তবুও তিনি লোন নিয়ে গাড়িটি কিনবেন। কেন?
কারণ তিনি “সুযোগ ব্যয়” (Opportunity Cost) বোঝেন।
যদি তিনি ১ কোটি টাকা নগদ দিয়ে গাড়িটি কেনেন, তবে সেই টাকাটা চিরতরে চলে গেল। ওই টাকা আর অন্য কোথাও খাটানো যাবে না।
কিন্তু যদি তিনি গাড়িটি ৭-৮% সুদে লোন নিয়ে কেনেন এবং তার নিজের ১ কোটি টাকা তার ব্যবসায় বা শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করেন যেখানে তিনি ১৫% রিটার্ন পান—তবে তিনি মাঝখানের পার্থক্যটা (১৫% – ৮% = ৭%) লাভ করছেন।
একে বলে আরবিট্রেজ (Arbitrage)। অর্থাৎ, ব্যাংককে কম সুদ দিয়ে, নিজের টাকাকে বেশি আয়ের জায়গায় খাটানো। ধনীরা লোন নেন কারণ তাদের টাকা ব্যাংকের সুদের হারের চেয়ে বেশি গতিতে বাড়তে পারে।
অধ্যায় ৫: ক্রেডিট কার্ডের স্মার্ট ব্যবহার
শুধুমাত্র বড় লোন নয়, ধনীরা তাদের দৈনন্দিন খরচের জন্যও ডেবিট কার্ড বা ক্যাশের বদলে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করেন। কিন্তু তাদের ব্যবহারের পদ্ধতি সাধারণের চেয়ে আলাদা।
১. ফ্রি মানি (Free Float): ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করলে আপনি ৪৫-৫০ দিনের জন্য ব্যাংকের টাকা বিনা সুদে ব্যবহারের সুযোগ পান। ধনীরা এই সময়টুকু তাদের টাকা ব্যাংকে রেখে সুদ পান, আর খরচ করেন ব্যাংকের টাকায়। ২. রিওয়ার্ড পয়েন্ট: তারা তাদের বিশাল খরচের জন্য প্রিমিয়াম ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করেন। এর ফলে তারা যে রিওয়ার্ড পয়েন্ট পান, তা দিয়ে বিনামূল্যে ফাইভ-স্টার হোটেল বুকিং, বিজনেস ক্লাস ফ্লাইট বা শপিং করেন। অর্থাৎ, তাদের খরচের ওপর তারা ২-৩% পর্যন্ত ফেরত পাচ্ছেন। ৩. কখনোই সুদ দেন না: ধনীরা বা স্মার্ট ব্যবহারকারীরা কখনোই ‘মিনিমাম ডিউ’ দেন না। তারা অটো-পে (Auto-pay) চালু রাখেন এবং ডিউ ডেটের আগেই পুরো টাকা শোধ করে দেন। ফলে ব্যাংক তাদের কাছ থেকে এক টাকাও সুদ পায় না।
অধ্যায় ৬: ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা (সতর্কবার্তা)
লোন নিয়ে ধনী হওয়ার এই কৌশলগুলো শুনতে খুব আকর্ষণীয় লাগলেও, এতে ঝুঁকি আছে। মনে রাখবেন, “লোন হলো আগুনের মতো। এটি দিয়ে আপনি যেমন সুস্বাদু রান্না করতে পারেন, তেমনি অসতর্ক হলে এটি আপনার হাত পুড়িয়ে দিতে পারে।”
ধনীরা লোন নিয়ে সফল হন কারণ: ১. তাদের একাধিক আয়ের উৎস (Multiple Income Streams) থাকে। ২. তাদের প্রচুর ক্যাশ ফ্লো (Cash Flow) থাকে যা দিয়ে তারা ইএমআই দিতে পারেন। ৩. তাদের একটি ইমার্জেন্সি ফান্ড থাকে।
আপনি যদি এমন লোন নেন যার ইএমআই দেওয়ার ক্ষমতা আপনার নেই, বা এমন ব্যবসায় লোন নেন যা আপনি বোঝেন না—তবে এই কৌশল আপনাকে দেউলিয়া করে দিতে পারে।
উপসংহার: মানসিকতার পরিবর্তন
ঋণ বা লোন খারাপ নয়; ঋণের অব্যবস্থাপনা খারাপ।
একজন ধনী এবং একজন গরীবের মধ্যে পার্থক্য তাদের ব্যাংক ব্যালেন্সে নয়, তাদের মানসিকতায়। ধনীরা ঝুঁকি নিতে শেখেন, তারা ফিনান্সিয়াল এডুকেশন নেন এবং তারা জানেন কীভাবে ব্যাংকের টাকাকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে হয়।
আপনার লক্ষ্য যদি হয় স্মার্টলি সম্পদ তৈরি করা, তবে অন্ধভাবে লোনকে ভয় পাবেন না। শিখুন কীভাবে ‘ভালো ঋণ’ নিতে হয় এবং কীভাবে সেই ঋণের টাকা খাটিয়ে নিজের সম্পদ বাড়াতে হয়।
আপনার প্রথম পদক্ষেপ: আজই আপনার বর্তমান লোনগুলো অডিট করুন। দেখুন আপনার কতগুলো ‘ভালো ঋণ’ আর কতগুলো ‘খারাপ ঋণ’ আছে। খারাপ ঋণগুলো দ্রুত শোধ করুন এবং ভালো ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করুন।







