আপনার প্রথম ক্রেডিট কার্ড কীভাবে ব্যবহার করবেন ?
প্রথমবার ক্রেডিট কার্ড হাতে পাওয়াটা বেশ উত্তেজনার। এটি আপনার আর্থিক স্বাধীনতার প্রথম ধাপ হতে পারে, তবে একই সাথে এটি একটি বড় দায়িত্বও। ক্রেডিট কার্ড হলো একটি তলোয়ারের মতো—সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এটি আপনার অনেক উপকারে আসবে, কিন্তু ভুল ব্যবহারে এটি বিপদ ডেকে আনতে পারে।
এই গাইডে আমরা আলোচনা করবো কীভাবে আপনি আপনার প্রথম ক্রেডিট কার্ডটি বুদ্ধিমত্তার সাথে ব্যবহার করে সর্বোচ্চ সুবিধা পেতে পারেন এবং ঋণ-ফাঁদ এড়াতে পারেন।
ক্রেডিট কার্ড কী? এটি ডেবিট কার্ড থেকে কীভাবে আলাদা?
সহজ কথায়, ক্রেডিট কার্ড হলো একটি “ধার” নেওয়ার কার্ড। আপনি যখন এটি দিয়ে কিছু কেনেন, তখন কার্ড প্রদানকারী ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান আপনার হয়ে বিক্রেতাকে টাকা দিয়ে দেয়। মাস শেষে আপনাকে সেই ধার শোধ করতে হয়।
অন্যদিকে, ডেবিট কার্ড আপনার সেভিংস বা চেকিং অ্যাকাউন্টের সাথে যুক্ত থাকে। আপনি খরচ করলে সরাসরি আপনার অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা কেটে নেওয়া হয়। অর্থাৎ, ডেবিট কার্ডে আপনি নিজের জমানো টাকা খরচ করেন, আর ক্রেডিট কার্ডে আপনি ব্যাংকের টাকা ধার করেন, যা পরে শোধ করতে হয়।
প্রথমবার ব্যবহারকারীদের জন্য ৫টি গোল্ডেন রুল
আপনার প্রথম ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রে এই ৫টি নিয়ম অবশ্যই মেনে চলুন:
১. বাজেট মেনে চলুন (খরচ করুন নিজের টাকার মতোই)
সবচেয়ে বড় ভুল হলো ক্রেডিট কার্ডকে “অতিরিক্ত” বা “ফ্রি” টাকা মনে করা। কার্ড পাওয়ার সাথে সাথেই আপনার খরচের একটি মাসিক বাজেট ঠিক করুন এবং সেই বাজেট কঠোরভাবে মেনে চলুন। এমন কোনো জিনিস ক্রেডিট কার্ডে কিনবেন না, যা আপনি আপনার সেভিংস বা ডেবিট কার্ড দিয়ে এই মুহূর্তে কিনতে পারতেন না।
২. সম্পূর্ণ বিল সময়মতো পরিশোধ করুন (সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ)
প্রতি মাসে আপনার একটি বিলিং স্টেটমেন্ট আসবে। সেখানে দুটি অপশন থাকবে: ‘মিনিমাম ডিউ’ (Minimum Due) বা ন্যূনতম প্রদেয় এবং ‘টোটাল ডিউ’ (Total Due) বা মোট প্রদেয়।
- ফাঁদ: শুধু ‘মিনিমাম ডিউ’ পরিশোধ করা একটি বড় ফাঁদ। আপনি যদি শুধু মিনিমাম টাকা দেন, তবে বাকি টাকার ওপর আপনাকে বিশাল অঙ্কের সুদ (অনেক ক্ষেত্রে বার্ষিক ৩০% থেকে ৪০%) দিতে হবে।
- সঠিক উপায়: সর্বদা ‘টোটাল ডিউ’ বা সম্পূর্ণ বিল নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে পরিশোধ করুন। এতে আপনাকে কোনো সুদ দিতে হবে না এবং আপনার ক্রেডিট স্কোরও ভালো থাকবে।
৩. আপনার ক্রেডিট লিমিটের ৩০% এর বেশি ব্যবহার না করা
প্রতিটি কার্ডের একটি নির্দিষ্ট খরচের সীমা (Credit Limit) থাকে। ধরুন, আপনার লিমিট ৫০,০০০ টাকা। ভালো ক্রেডিট স্কোর তৈরির জন্য বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন যে, আপনার মোট লিমিটের ৩০% এর বেশি এক মাসে ব্যবহার না করাই উত্তম (অর্থাৎ, ১৫,০০০ টাকার কম)। একে ‘ক্রেডিট ইউটিলাইজেশন রেশিও’ (Credit Utilization Ratio) বলে। এর মানে এই নয় যে আপনি এর বেশি খরচ করতে পারবেন না, তবে কম ব্যবহার করা আপনার স্কোরের জন্য ভালো।
৪. সুদ এবং চার্জ সম্পর্কে সচেতন থাকুন
কার্ড নেওয়ার সময়ই এর বার্ষিক ফি (Annual Fee), লেট পেমেন্ট ফি (Late Payment Fee) এবং অন্যান্য চার্জ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা নিন। বেশিরভাগ কার্ডেই প্রথম বছর ফি-মুক্ত থাকে, কিন্তু দ্বিতীয় বছর থেকে চার্জ লাগতে পারে। এই চার্জগুলো জানা থাকলে আপনি অনাকাঙ্ক্ষিত খরচ থেকে বাঁচবেন।
৫. আপনার ক্রেডিট স্কোর (Credit Score) তৈরি করুন
ক্রেডিট কার্ড নেওয়ার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো একটি ভালো ‘ক্রেডিট স্কোর’ বা ‘CIBIL স্কোর’ তৈরি করা। আপনি যখন সময়মতো বিল পরিশোধ করেন, তখন আপনার স্কোর বাড়তে থাকে। এই ভালো স্কোর আপনাকে ভবিষ্যতে সহজেই গাড়ি, বাড়ি বা ব্যক্তিগত লোন পেতে সাহায্য করবে।
যে ৩টি কাজ কখনোই করবেন না
১. ক্রেডিট কার্ড দিয়ে ক্যাশ তোলা (Cash Advance): এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল। টাকা তোলার দিন থেকেই এর ওপর উচ্চ হারে সুদ এবং একটি বড় ফি দিতে হয়। ইমার্জেন্সি ছাড়া এটা কখনোই করবেন না। ২. অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা: লিমিট আছে বলেই খরচ করতে হবে—এই মানসিকতা পরিহার করুন। দরকারি জিনিস ছাড়া অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা এড়িয়ে চলুন। ৩. পিন বা পাসওয়ার্ড শেয়ার করা: আপনার কার্ডের পিন, সিভিভি (CVV) নম্বর বা ওটিপি (OTP) কখনোই কারো সাথে শেয়ার করবেন না, এমনকি ব্যাংকের লোক পরিচয় দিলেও না।
শেষ কথা
আপনার প্রথম ক্রেডিট কার্ডটি আপনার আর্থিক ভবিষ্যতের একটি গুরুত্বপূর্ণ চাবিকাঠি। এটিকে দায়িত্বের সাথে ব্যবহার করুন, সময়মতো বিল দিন এবং আপনার আয়ের চেয়ে বেশি খরচ করা থেকে বিরত থাকুন। এই সহজ নিয়মগুলো মেনে চললে ক্রেডিট কার্ড আপনার জন্য ঋণের বোঝা না হয়ে, সম্পদে পরিণত হবে।

