মুদ্রাস্ফীতি (Inflation) কী? এটি কীভাবে নীরবে আপনার জমানো টাকাকে শেষ করে দিচ্ছে?
আপনার বাবা-মা বা দাদু-ঠাকুমার কাছে কি কখনও গল্প শুনেছেন? “আমাদের সময়ে এক টাকায় ৪টা সিঙাড়া পাওয়া যেত” অথবা “পুরো মাসের বাজার ৫০০ টাকাতেই হয়ে যেত!”
এই কথাগুলো শোনার পর আমরা হয়তো ভাবি, “আহা! কী সস্তা ছিল সে সময়!” কিন্তু আমরা খুব কমই ভাবি যে, কেন আজ সেই ১ টাকায় একটি লজেন্সও ঠিকমতো পাওয়া যায় না।
এর পেছনের মূল খলনায়কটির নাম হলো “মুদ্রাস্ফীতি” (Inflation)।
এটি এমন একটি অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া যা আমাদের কষ্টার্জিত সঞ্চয়ের ওপর নীরবে আক্রমণ চালায়। “Glance Today”-এর এই ব্লগে আমরা সহজ ভাষায় জানব মুদ্রাস্ফীতি কী এবং কেন একে আপনার টাকার “নীরব ঘাতক” বা “Silent Killer” বলা হয়।
মুদ্রাস্ফীতি (Inflation) আসলে কী?
খুব সহজ ভাষায়, মুদ্রাস্ফীতি হলো সময়ের সাথে সাথে জিনিসপত্র এবং পরিষেবার দাম বেড়ে যাওয়া।
এর মানে হলো, আজকে ১০০ টাকা দিয়ে আপনি যে পরিমাণ জিনিস কিনতে পারছেন, ঠিক এক বছর পর সেই একই জিনিস কিনতে আপনার আরও বেশি টাকার প্রয়োজন হবে। অর্থাৎ, মুদ্রাস্ফীতি আপনার টাকার মূল্য বা ক্রয়ক্ষমতা (Purchasing Power) কমিয়ে দেয়।
একটি সহজ উদাহরণ:
ধরুন, ২০২২ সালে এক কেজি চালের দাম ছিল ৫০ টাকা। ২০২৩ সালে সেই একই চালের দাম বেড়ে হলো ৫৫ টাকা।
এর মানে হলো, এই এক বছরে চালের দামে ১০% মুদ্রাস্ফীতি হয়েছে। আপনার কাছে যদি ৫০ টাকাই থাকে, তবে ২০২৩ সালে আপনি আর এক কেজি চাল কিনতে পারবেন না। আপনার টাকার “ক্ষমতা” কমে গেছে।
কেন এটি আপনার জমানো টাকার “নীরব ঘাতক”?
আমরা অনেকেই ভাবি, “আমি টাকা খরচ করছি না, আমি তো টাকা জমাচ্ছি। আমার টাকা ব্যাঙ্কে বা আলমারিতে সুরক্ষিত আছে।”
দুর্ভাগ্যবশত, মুদ্রাস্ফীতির কারণে আপনার এই “সুরক্ষিত” টাকাও আর সুরক্ষিত নয়। আসুন দেখি কীভাবে:
দৃশ্যকল্প ১: আলমারি বা ক্যাশ বাক্সে জমানো টাকা
ধরুন, আপনি খুব কষ্ট করে ১ লক্ষ টাকা জমিয়েছেন এবং নিরাপত্তার জন্য সেটি আপনার বাড়ির আলমারিতে তালাবন্ধ করে রেখেছেন।
- আজ (২০২৫ সাল): আপনার কাছে আছে ১,০০,০০০ টাকা।
- ধরুন, দেশে বার্ষিক মুদ্রাস্ফীতির হার ৭%।
- ১০ বছর পর (২০৩৫ সাল): আপনি আলমারি খুললেন এবং দেখলেন আপনার ১,০০,০০০ টাকা ঠিক তেমনই আছে। একটি নোটও কমেনি।
কিন্তু আসল ক্ষতিটা কোথায় হলো?
১০ বছর ধরে প্রতি বছর ৭% হারে দাম বাড়ার ফলে, আজকের ১ লক্ষ টাকার আসল ক্রয়ক্ষমতা ১০ বছর পর প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে (প্রায় ৫০,৮৩৪ টাকা)।
অর্থাৎ, আপনার আলমারি থেকে একটি টাকাও চুরি যায়নি, কিন্তু মুদ্রাস্ফীতি আপনার টাকার অর্ধেক মূল্য বা ক্ষমতা “চুরি” করে নিয়ে গেছে। এটিই হলো নীরব ঘাতকের কাজ।
দৃশ্যকল্প ২: সেভিংস অ্যাকাউন্টে জমানো টাকা (সবচেয়ে বড় ফাঁদ)
আপনি হয়তো বলবেন, “আমি তো বোকা নই! আমি টাকা আলমারিতে রাখি না, আমি ব্যাঙ্কের সেভিংস অ্যাকাউন্টে (Savings Account) রাখি। আমি তো সুদ (Interest) পাই।”
এটাই মুদ্রাস্ফীতির সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে বিভ্রান্তিকর ফাঁদ। আসুন হিসাব করে দেখি।
ধরুন, আপনি আপনার ১ লক্ষ টাকা একটি সেভিংস অ্যাকাউন্টে রেখেছেন, যা আপনাকে বার্ষিক ৪% সুদ দেয়।
কিন্তু, ধরা যাক ওই একই সময়ে দেশের বার্ষিক মুদ্রাস্ফীতির হার ৭%।
- আপনার টাকা বাড়ছে: ৪% হারে।
- জিনিসের দাম বাড়ছে: ৭% হারে।
আপনার আসল লোকসান (Real Return) = সুদের হার – মুদ্রাস্ফীতির হার
= ৪% – ৭%
= -৩% (মাইনাস তিন শতাংশ!)
এর মানে হলো, আপনার টাকা ব্যাঙ্কে “সুরক্ষিত” রেখেও আপনি প্রতি বছর নীরবে আপনার টাকার ৩% ক্রয়ক্ষমতা হারাচ্ছেন। আপনার টাকা বাড়ছে ঠিকই, কিন্তু তার চেয়ে অনেক দ্রুত গতিতে সেটিকে খরচ করার ক্ষমতা কমে যাচ্ছে।
মুদ্রাস্ফীতি কেন হয়? (খুব সংক্ষেপে)
এর পেছনে অনেক জটিল অর্থনৈতিক কারণ থাকতে পারে, তবে প্রধান দুটি কারণ হলো:
১. চাহিদা বৃদ্ধি (Demand-Pull): যখন বাজারে টাকার জোগান বেড়ে যায় এবং মানুষ বেশি জিনিস কিনতে চায়, কিন্তু সেই তুলনায় জিনিসের জোগান কম থাকে, তখন দাম বাড়ে।
২. খরচ বৃদ্ধি (Cost-Push): যখন কোনো জিনিস তৈরির কাঁচামালের দাম (যেমন: পেট্রোল, ডিজেল, কাঁচামাল) বা শ্রমের দাম বেড়ে যায়, তখন কোম্পানিগুলো সেই বাড়তি খরচ পুষিয়ে নিতে জিনিসের দাম বাড়িয়ে দেয়।
তাহলে বাঁচার উপায় কী?
এতক্ষণে আপনি নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন যে, শুধু টাকা জমানো (Saving) যথেষ্ট নয়। টাকা জমানো একটি ভালো শুরু, কিন্তু এটি আপনাকে মুদ্রাস্ফীতির হাত থেকে বাঁচাতে পারবে না।
বাঁচার একমাত্র উপায় হলো আপনার টাকাকে এমন জায়গায় খাটানো (Invest) যা মুদ্রাস্ফীতির চেয়ে বেশি হারে বাড়তে পারে।
যদি মুদ্রাস্ফীতি ৭% হয়, তবে আপনাকে এমন একটি উপায় খুঁজে বের করতে হবে যা আপনাকে বার্ষিক অন্তত ৭%-এর বেশি রিটার্ন (Return) বা লাভ দিতে পারে।
আর এখানেই আসে “বিনিয়োগ” (Investment)-এর গুরুত্ব।
- ফিক্সড ডিপোজিট (FD): এটিও অনেক সময় মুদ্রাস্ফীতিকে হারাতে পারে না (ট্যাক্স বাদ দেওয়ার পর)।
- সোনা বা গোল্ড বন্ড: এটি ঐতিহ্যগতভাবে মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে একটি ভালো সুরক্ষা হিসেবে কাজ করে।
- মিউচুয়াল ফান্ড বা স্টক মার্কেট: দীর্ঘমেয়াদে (Long-term) ইক্যুইটি মিউচুয়াল ফান্ড বা ভালো কোম্পানির স্টক ঐতিহাসিকভাবে মুদ্রাস্ফীতির চেয়ে অনেক বেশি রিটার্ন দিয়ে এসেছে (যদিও এতে ঝুঁকি জড়িত)।
শেষ কথা
মুদ্রাস্ফীতি একটি অর্থনৈতিক বাস্তবতা। একে আপনি থামাতে পারবেন না, কিন্তু আপনি একে হারাতে (Beat) পারবেন।
যদি আপনি আপনার কষ্টার্জিত টাকাকে ভালোবাসেন এবং তার মূল্য বজায় রাখতে চান, তবে শুধু “সঞ্চয়কারী” (Saver) হয়ে বসে থাকলে চলবে না। আপনাকে একজন “বিনিয়োগকারী” (Investor) হতে হবে।
আপনার টাকা যদি মুদ্রাস্ফীতির চেয়ে দ্রুত দৌড়াতে না পারে, তবে এটি নিশ্চিত যে সময়ের সাথে সাথে এটি পিছিয়ে পড়বে এবং এর মূল্য হারাবে।

