শেয়ার মার্কেট: একদম নতুনদের জন্য সহজ গাইড (জুয়া নাকি বিজ্ঞান?)
“শেয়ার বাজার তো একটা ফাটকা বাজার, এখানে মানুষ শুধুই টাকা হারায়!”
আপনি নিশ্চয়ই আপনার পাড়ার চায়ের দোকানে বা গুরুজনদের মুখে এই কথাটি শুনেছেন। আমাদের সমাজে শেয়ার বাজার বা স্টক মার্কেট (Stock Market) নিয়ে এক ধরনের ভীতি কাজ করে। অনেকেই মনে করেন এটি ক্যাসিনো বা লটারির মতো একটি জুয়ার জায়গা।
কিন্তু সত্যিটা হলো, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিরা (যেমন ওয়ারেন বাফেট বা রাকেশ ঝুনঝুনওয়ালা) এই বাজার থেকেই তাদের সম্পদ গড়েছেন। শেয়ার বাজার জুয়া নয়, যদি আপনি এটি বুঝে করেন। আর যদি না বুঝে করেন, তবে এটি জুয়ার চেয়েও বিপদজনক।
১. শেয়ার (Share) আসলে কী?
খুব সহজ ভাষায়, ‘শেয়ার’ মানে হলো অংশীদারিত্ব বা মালিকানা।
ধরুন, আপনার বন্ধু ‘রোহিত’ একটি বিস্কুটের ফ্যাক্টরি খুলতে চায়। তার মোট ১০ লক্ষ টাকা প্রয়োজন। তার কাছে আছে ৫ লক্ষ টাকা। সে আপনাকে বলল, “তুই বাকি ৫ লক্ষ টাকা দে, তাহলে লাভের ৫০% তোর।”
আপনি যখন ৫ লক্ষ টাকা দিলেন, আপনি ওই কোম্পানির ৫০% মালিক হয়ে গেলেন।
শেয়ার বাজারও ঠিক এভাবেই কাজ করে। টাটা, রিলায়েন্স বা ইনফোসিসের মতো বড় কোম্পানিগুলো তাদের ব্যবসার প্রয়োজনে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা তোলে। বিনিময়ে তারা আপনাকে কোম্পানির ছোট একটি অংশের মালিকানা দেয়। এই ছোট অংশটিই হলো ‘শেয়ার’।
আপনি যখন কোনো কোম্পানির শেয়ার কেনেন, আপনি আসলে ওই কোম্পানির একজন গর্বিত অংশীদার (Partner) হন।
২. শেয়ার বাজার কীভাবে কাজ করে? (NSE ও BSE)
ভারতে শেয়ার কেনা-বেচা করার জন্য দুটি প্রধান বাজার বা দোকান আছে: ১. BSE (Bombay Stock Exchange): এটি এশিয়ার সবচেয়ে পুরনো স্টক এক্সচেঞ্জ। ২. NSE (National Stock Exchange): এটি ভারতের সবচেয়ে বড় স্টক এক্সচেঞ্জ।
আমরা সরাসরি এই এক্সচেঞ্জ থেকে শেয়ার কিনতে পারি না। আমাদের মাঝখানে একজন ‘দালাল’ বা ব্রোকার (Broker) প্রয়োজন হয় (যেমন: Zerodha, Groww, Angel One, বা আপনার ব্যাংকের সিকিউরিটিজ)। আমরা অ্যাপের মাধ্যমে অর্ডার দিই, ব্রোকার সেই অর্ডার এক্সচেঞ্জে পাঠায় এবং শেয়ার কেনা হয়।
৩. শেয়ারের দাম বাড়ে বা কমে কেন?
এটি পুরোপুরি চাহিদা (Demand) এবং জোগান (Supply)-এর ওপর নির্ভর করে।
- দাম বাড়ে: যখন কোম্পানি ভালো লাভ করে, তখন সবাই সেই কোম্পানির অংশীদার হতে চায়। অর্থাৎ কেনার লোক বেশি, কিন্তু বেচার লোক কম। তখন শেয়ারের দাম বাড়ে।
- দাম কমে: যখন কোম্পানি লোকসান করে বা কোনো খারাপ খবর আসে, তখন সবাই মালিকানা ছেড়ে পালাতে চায়। অর্থাৎ বেচার লোক বেশি, কেনার লোক কম। তখন দাম কমে।
৪. কেন আপনি শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করবেন?
শুধু ব্যাংকে টাকা রেখে আপনি ধনী হতে পারবেন না।
- মুদ্রাস্ফীতি (Inflation): জিনিসের দাম বাড়ছে ৭% হারে।
- ব্যাংক সুদ: সেভিংস অ্যাকাউন্টে পাচ্ছেন ৩-৪%।
অর্থাৎ, ব্যাংকে টাকা রেখে আপনি আসলে গরীব হচ্ছেন। শেয়ার বাজার হলো একমাত্র জায়গা যা দীর্ঘমেয়াদে মুদ্রাস্ফীতির চেয়ে অনেক বেশি (গড়ে ১২-১৫%) রিটার্ন দিতে পারে। এটিই আপনার টাকাকে চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়ানোর সেরা উপায়।
৫. সেনসেক্স (Sensex) এবং নিফটি (Nifty) কী?
খবরের কাগজে রোজ দেখেন “সেনসেক্স বাড়ল” বা “নিফটি পড়ল”। এগুলো কী?
এগুলো হলো বাজারের সূচক বা মিটার (Index)। বাজারে হাজার হাজার কোম্পানি আছে, সবগুলোর খবর রাখা সম্ভব নয়। তাই সেরা কোম্পানিগুলো নিয়ে এই সূচক তৈরি হয়।
- Sensex (BSE): বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জের সেরা ৩০টি বড় কোম্পানির গড় পারফরম্যান্স দেখায়।
- Nifty 50 (NSE): ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জের সেরা ৫০টি বড় কোম্পানির গড় পারফরম্যান্স দেখায়।
যদি নিফটি বাড়ে, তার মানে দেশের সেরা ৫০টি কোম্পানি ভালো করছে, অর্থাৎ দেশের অর্থনীতি ভালো যাচ্ছে।
৬. নতুনদের জন্য শুরু করার ৫টি ধাপ
আপনি যদি আজই বিনিয়োগ শুরু করতে চান, তবে এই ধাপগুলো অনুসরণ করুন:
ধাপ ১: ডিম্যাট ও ট্রেডিং অ্যাকাউন্ট খুলুন শেয়ার রাখার জন্য ‘ডিম্যাট অ্যাকাউন্ট’ (Demat Account) লাগে। এটি ব্যাংকের অ্যাকাউন্টের মতোই, শুধু টাকার বদলে এখানে শেয়ার জমা থাকে। প্যান কার্ড, আধার কার্ড এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে অনলাইনে ১০ মিনিটেই এটি খোলা যায়।
ধাপ ২: অল্প দিয়ে শুরু করুন শুরুতেই লক্ষ টাকা লাগানোর দরকার নেই। মাত্র ৫০০ বা ১০০০ টাকা দিয়ে শুরু করুন। প্রথমে শিখুন, তারপর বাড়ান।
ধাপ ৩: লার্জ ক্যাপ (Large Cap) কোম্পানিতে থাকুন নতুন অবস্থায় ছোট বা অচেনা কোম্পানিতে বিনিয়োগ করবেন না। টাটা, রিলায়েন্স, এইচডিএফসি-র মতো বড় এবং বিশ্বস্ত (Blue-chip) কোম্পানি বেছে নিন। এরা হুট করে ডুবে যাবে না।
ধাপ ৪: দীর্ঘমেয়াদী চিন্তা করুন (Long Term) শেয়ার বাজার কোনো “রাতারাতি বড়লোক হওয়ার স্কিম” নয়। এখানে টাকা বাড়ে গাছের মতো। আজ চারা লাগালে ফল পেতে ৫-১০ বছর সময় দিতে হবে। আপনি যদি ১০ মিনিটের জন্য আসেন, তবে এটি জুয়া। যদি ১০ বছরের জন্য আসেন, তবে এটি বিনিয়োগ।
ধাপ ৫: কারো টিপস (Tips) শুনে কিনবেন না “ভাই, এই শেয়ারটা কেন, কাল ডাবল হবে!”—বন্ধুবান্ধব বা সোশ্যাল মিডিয়ার এই টিপস থেকে দূরে থাকুন। নিজে একটু গবেষণা করুন বা মিউচুয়াল ফান্ডের মাধ্যমে বিনিয়োগ করুন।
শেষ কথা
শেয়ার বাজার ভয়ের জায়গা নয়, এটি ধৈর্যের জায়গা। এখানে তারাই সফল হয়, যারা ভয় না পেয়ে নিয়মিত এবং দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ করে।
আজই আপনার প্রথম পদক্ষেপটি নিন। মনে রাখবেন, “শেয়ার বাজার ঝুঁকি সাপেক্ষ, কিন্তু বিনিয়োগ না করাটা তার চেয়েও বড় ঝুঁকি।”

