লোন পাচ্ছেন না? মাত্র ৬ মাসে সিভিল (CIBIL) স্কোর বাড়ানোর গোপন টিপস
আপনি কি স্বপ্নের বাড়িটি কেনার জন্য হোম লোনের আবেদন করেছিলেন, কিন্তু ব্যাংক মুখের ওপর ‘না’ বলে দিয়েছে? অথবা একটি ক্রেডিট কার্ডের খুব প্রয়োজন ছিল, কিন্তু আবেদনটি বারবার রিজেক্ট হচ্ছে?
ব্যাংকের রিজেকশন লেটারে হয়তো একটিই কারণ লেখা ছিল—“Low CIBIL Score” বা কম সিভিল স্কোর।
আজকের দিনে আপনার পকেটে কত টাকা আছে, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো আপনার সিভিল স্কোর কত। এটি আপনার আর্থিক জীবনের ‘রিপোর্ট কার্ড’। স্কুলে যেমন ভালো নম্বর না পেলে ভালো কলেজে ভর্তি হওয়া যায় না, তেমনই সিভিল স্কোর ৭৫০-এর নিচে হলে ব্যাংক আপনাকে লোন বা ক্রেডিট কার্ড দিতে চায় না।
অনেকে মনে করেন, একবার সিভিল স্কোর খারাপ হয়ে গেলে তা আর ঠিক করা সম্ভব নয়। এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। সঠিক কৌশল এবং একটু আর্থিক শৃঙ্খলা মেনে চললে মাত্র ৬ থেকে ৮ মাসের মধ্যেই আপনার স্কোর ৬০০ থেকে ৭৫০-এ নিয়ে যাওয়া সম্ভব।
১. সিভিল (CIBIL) স্কোর আসলে কী?
সহজ কথায়, সিভিল স্কোর হলো ৩০০ থেকে ৯০০-এর মধ্যে একটি তিন সংখ্যার নম্বর, যা ব্যাংককে বলে দেয় আপনি টাকা ধার নিয়ে তা ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে কতটা বিশ্বস্ত।
- ৭৫০ – ৯০০: এটি হলো “এক্সিলেন্ট” (Excellent) স্কোর। ব্যাংক আপনাকে লোন দেওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকবে এবং আপনি কম সুদে লোন পাবেন।
- ৬৫০ – ৭৫০: এটি “গুড” (Good) স্কোর। আপনি লোন পাবেন, তবে ব্যাংক একটু যাচাই-বাছাই করবে।
- ৫৫০ – ৬৫০: এটি “এভারেজ” (Average) বা ঝুঁকিপূর্ণ জোন। লোন পাওয়া কঠিন, পেলেও সুদের হার অনেক বেশি হবে।
- ৫৫০-এর নিচে: এটি “পুওর” (Poor) স্কোর। এই অবস্থায় লোন পাওয়া প্রায় অসম্ভব।
কেন আপনার স্কোর কমে যায়? (রোগ নির্ণয়)
সমাধানে যাওয়ার আগে সমস্যাটা বোঝা জরুরি। আপনার স্কোর কেন কমেছে, তা না জানলে আপনি তা ঠিক করতে পারবেন না। মূলত ৪টি কারণে স্কোর কমে:
১. পেমেন্ট মিস করা: আপনি যদি লোন বা ক্রেডিট কার্ডের ইএমআই (EMI) সময়মতো না দেন। (এটি স্কোরের ৩৫% নিয়ন্ত্রণ করে)। 2. ক্রেডিট লিমিট শেষ করা: আপনার কার্ডের লিমিট ১ লক্ষ টাকা, আর আপনি ৯০ হাজার টাকাই খরচ করে ফেলছেন। 3. বেশি লোন নেওয়া: অল্প সময়ের মধ্যে অনেকগুলো লোন বা ক্রেডিট কার্ড নেওয়া। 4. ভুল তথ্য: ব্যাংকের ভুলে আপনার রিপোর্টে ভুল তথ্য থাকা।
২.সিভিল স্কোর বাড়ানোর ৭টি পরীক্ষিত উপায় (Step-by-Step)
এখন আসুন মূল অ্যাকশন প্ল্যানে। আগামী ৬ মাস এই নিয়মগুলো মেনে চললে আপনার স্কোর বাড়তে বাধ্য।
টিপস ১: পেমেন্ট ডিউ ডেটের আগেই দিন (সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ)
আপনার সিভিল স্কোরের সবচেয়ে বড় শত্রু হলো—“Late Payment”।
- কী করবেন: আপনার ফোনের ক্যালেন্ডারে বা ব্যাংকিং অ্যাপে ‘Auto-pay’ অপশন চালু করুন। ডিউ ডেট বা শেষ তারিখের অন্তত ৩ দিন আগে পেমেন্ট করার অভ্যাস করুন।
- সতর্কতা: ব্যাংক আপনাকে দুটি অপশন দেয়—’Total Amount Due’ এবং ‘Minimum Amount Due’। কখনোই শুধু ‘Minimum Due’ দিয়ে বসে থাকবেন না। এটি একটি ফাঁদ। এতে আপনার ওপর বিশাল সুদ চাপে এবং সিভিল স্কোরে দেখায় যে আপনি পুরো টাকা শোধ করতে পারছেন না। সর্বদা ‘Total Due’ পরিশোধ করুন।
টিপস ২: ৩০% রুল মেনে চলুন (Credit Utilization Ratio)
এটি এমন একটি গোপন টিপস যা ব্যাংক আপনাকে বলে না। আপনার ক্রেডিট কার্ড আছে মানেই পুরো টাকা খরচ করতে হবে, এমন নয়।
সিভিল বা ক্রেডিট ব্যুরো দেখে যে আপনি আপনার লিমিটের কত শতাংশ ব্যবহার করছেন। একে বলে Credit Utilization Ratio।
- খারাপ অভ্যাস: লিমিট ১ লক্ষ টাকা, খরচ করেছেন ৮০,০০০ টাকা (৮০% ব্যবহার)। এতে ব্যাংক মনে করে আপনি টাকার জন্য মরিয়া (Credit Hungry)। এতে স্কোর কমে।
- ভালো অভ্যাস: লিমিট ১ লক্ষ টাকা, খরচ করুন সর্বোচ্চ ৩০,০০০ টাকা (৩০% ব্যবহার)।
- সমাধান: যদি আপনার খরচ বেশি হয়, তবে ব্যাংকে ফোন করে আপনার ক্রেডিট লিমিট বাড়াতে বলুন অথবা দুটি আলাদা কার্ড ব্যবহার করে খরচ ভাগ করে দিন।
টিপস ৩: ঘন ঘন লোনের আবেদন করবেন না (Hard Enquiry)
আপনি যখনই কোনো ব্যাংকে লোন বা কার্ডের জন্য আবেদন করেন, ব্যাংক সিভিল-এর কাছে আপনার রিপোর্ট চায়। একে বলা হয় “Hard Enquiry”।
আপনি যদি এক মাসের মধ্যে ৪টি ব্যাংকে লোনের জন্য আবেদন করেন, তবে আপনার সিভিল রিপোর্টে ৪টি ‘Hard Enquiry’ জমা হবে। এটি আপনার স্কোরকে হুট করে ২০-৩০ পয়েন্ট কমিয়ে দিতে পারে। ব্যাংক ভাববে আপনি ঋণের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছেন।
- কী করবেন: লোন পাওয়ার সম্ভাবনা নিশ্চিত না হয়ে আবেদন করবেন না। অনলাইনে বারবার ‘Check Eligibility’ বাটনে ক্লিক করা বন্ধ করুন।
টিপস ৪: পুরনো ক্রেডিট কার্ড বন্ধ করবেন না
অনেকেই লোন শোধ হয়ে গেলে বা কার্ডের দরকার না থাকলে পুরনো ক্রেডিট কার্ড বন্ধ (Close) করে দেন। এটি একটি ভুল সিদ্ধান্ত হতে পারে।
ক্রেডিট স্কোরের একটি অংশ নির্ভর করে আপনার “ক্রেডিট হিস্ট্রি” (Credit History) বা আপনি কতদিন ধরে ঋণ ব্যবহার করছেন তার ওপর।
- ধরুন, আপনার একটি কার্ড ৫ বছরের পুরনো। এটি প্রমাণ করে যে আপনি দীর্ঘ ৫ বছর ধরে ব্যাংকের সাথে লেনদেন করছেন। আপনি যদি এটি বন্ধ করে দেন, তবে আপনার এই ৫ বছরের ভালো ইতিহাস মুছে যাবে এবং আপনার ‘ক্রেডিট এজ’ (Credit Age) কমে যাবে। ফলে স্কোর কমে যেতে পারে।
- কী করবেন: পুরনো কার্ডটি চালু রাখুন এবং মাঝেমধ্যে ছোটখাটো কেনাকাটা (যেমন মোবাইল রিচার্জ) করে বিল শোধ করুন।
টিপস ৫: সিভিল রিপোর্টে ভুল আছে কিনা দেখুন
বিশ্বাস করুন বা না করুন, অনেক সময় আপনার কোনো দোষ থাকে না, কিন্তু ব্যাংকের ভুলের কারণে আপনার স্কোর কমে যায়।
- হয়তো আপনি লোন শোধ করে দিয়েছেন, কিন্তু ব্যাংক সিভিল-কে আপডেট দেয়নি।
- অথবা অন্য কারো লোন ভুল করে আপনার প্যান কার্ডের সাথে লিংক হয়ে গেছে।
- কী করবেন: বছরে অন্তত একবার CIBIL-এর অফিশিয়াল ওয়েবসাইট বা Paytm/GPay থেকে আপনার বিস্তারিত রিপোর্ট ডাউনলোড করুন। যদি কোনো ভুল দেখেন (যেমন আপনার না নেওয়া কোনো লোন দেখাচ্ছে), তবে সাথে সাথে CIBIL-এর ওয়েবসাইটে “Dispute” রেইজ করুন। এটি ঠিক হলে স্কোর সাথে সাথেই বেড়ে যাবে।
টিপস ৬: ‘লোন সেটেলমেন্ট’ (Settlement) থেকে সাবধান!
এটি এমন একটি ভুল যা আপনার আর্থিক জীবন ধ্বংস করে দিতে পারে। আপনি যদি লোন শোধ করতে না পারেন, ব্যাংক অনেক সময় আপনাকে অফার দেয়: “আপনার ১ লক্ষ টাকার লোন বাকি, আপনি ৫০ হাজার টাকা দিন, আমরা লোনটি বন্ধ করে দেব।” একে বলে Settlement।
আপনি ভাবলেন টাকা বাঁচল। কিন্তু ব্যাংক সিভিল রিপোর্টে একে “Settled” হিসেবে মার্ক করে দেবে। এর মানে হলো—”এই ব্যক্তি পুরো টাকা ফেরত দিতে পারেনি।” এই দাগটি আগামী ৭ বছর আপনার রিপোর্টে থাকবে এবং এই সময়ের মধ্যে অন্য কোনো ব্যাংক আপনাকে লোন দেবে না।
- কী করবেন: কষ্ট হলেও পুরো টাকা দিয়ে লোনটি “Closed” করার চেষ্টা করুন, “Settled” নয়।
টিপস ৭: যাদের স্কোর নেই বা খুব কম, তাদের জন্য ‘ব্রহ্মাস্ত্র’ (Secured Card)
আপনার স্কোর যদি ৬০০-র নিচে হয়, তবে কোনো ব্যাংক আপনাকে লোন দেবে না। আর লোন না পেলে আপনি ভালো পেমেন্ট করে স্কোর ঠিকও করতে পারবেন না। এটি একটি চক্র।
এই চক্র ভাঙার উপায় হলো—FD বা ফিক্সড ডিপোজিট ভিত্তিক ক্রেডিট কার্ড (Secured Credit Card)।
- কীভাবে কাজ করে: ব্যাংকে গিয়ে ২০,০০০ বা ৩০,০০০ টাকার একটি ফিক্সড ডিপোজিট (FD) করুন। ব্যাংক আপনাকে সেই এফডি-র বিপরীতে একটি ক্রেডিট কার্ড দেবে (যাকে Secured Card বলে)।
- কৌশল: এই কার্ডটি নিন। প্রতি মাসে মাত্র ১০০০-২০০০ টাকা খরচ করুন এবং ডিউ ডেটের আগে বিল শোধ করুন।
- ফলাফল: যেহেতু এটি এফডি-র বিপরীতে, তাই ব্যাংক আপনাকে কার্ড দেবে। আর আপনি যখন নিয়মিত বিল দেবেন, ব্যাংক সিভিল-কে পজিটিভ রিপোর্ট পাঠাবে। মাত্র ৬ মাস এটি করলে আপনার স্কোর ৬০০ থেকে ৭৫০+ হয়ে যাবে। এটি গ্যারান্টিড উপায়!
শেষ কথা: ধৈর্যই আসল চাবিকাঠি
সিভিল স্কোর একদিনে নষ্ট হয়নি, তাই এটি একদিনে ঠিকও হবে না। ওপরের টিপসগুলো মেনে চললে আপনি প্রথম ৩ মাসেই পরিবর্তন দেখতে পাবেন।
মনে রাখবেন, একটি ভালো সিভিল স্কোর শুধু আপনাকে লোন পেতে সাহায্য করে না, এটি আপনাকে কম সুদে লোন পাইয়ে দিয়ে আপনার লক্ষ লক্ষ টাকা সাশ্রয় করতে পারে। তাই আজই আপনার আর্থিক রিপোর্ট কার্ডটি ঠিক করার মিশনে নেমে পড়ুন।
আপনার বর্তমান সিভিল স্কোর কত? কমেন্টে জানান!

