হোম লোন (Home Loan) নেওয়ার আগে এই ৫টি জিনিস অবশ্যই জানুন
নিজের একটি বাড়ি—এই স্বপ্ন আমাদের সবার। আর এই স্বপ্ন পূরণের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো হোম লোন (Home Loan)। কিন্তু একটি হোম লোন মানে শুধু ব্যাঙ্কে আবেদন করা আর চাবি হাতে পাওয়া নয়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক প্রতিশ্রুতি, যা আপনার জীবনের পরবর্তী ২০ থেকে ৩০ বছর পর্যন্ত চলতে পারে।
একটি ছোট ভুল বা সঠিক পরিকল্পনার অভাব আপনাকে দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক চাপে ফেলে দিতে পারে।
সেই ৫টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করব, যা হোম লোনের জন্য আবেদন করার আগে আপনার অবশ্যই জানা এবং পরিকল্পনা করা উচিত।
১. আপনার ক্রেডিট (CIBIL) স্কোর: লোনের প্রথম দরজা
ব্যাঙ্ক আপনাকে লোন দেওয়ার আগে প্রথম যে জিনিসটি দেখে, তা হলো আপনার ক্রেডিট স্কোর (Credit Score) বা CIBIL স্কোর। এটি মূলত আপনার আর্থিক শৃঙ্খলার রিপোর্ট কার্ড।
- ক্রেডিট স্কোর কী? আপনি আগে কোনো লোন বা ক্রেডিট কার্ডের বিল সময়মতো দিয়েছেন কিনা, তার ওপর ভিত্তি করে এই স্কোর তৈরি হয় (সাধারণত ৩০০-৯০০ এর মধ্যে)।
- কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?
- লোন অনুমোদন (Loan Approval): আপনার স্কোর কম হলে (সাধারণত ৭০০-এর নিচে) ব্যাঙ্ক আপনার লোনের আবেদন সরাসরি বাতিল করে দিতে পারে।
- সুদের হার (Interest Rate): আপনার স্কোর যত ভালো (৭৫০+), আপনার সুদের হার তত কম পাওয়ার সম্ভাবনা তত বেশি। স্কোর সামান্য কম হলেও আপনাকে ০.৫% থেকে ১% বেশি সুদ দিতে হতে পারে, যা লক্ষ লক্ষ টাকার পার্থক্য তৈরি করে।
কী করবেন: লোনের জন্য আবেদন করার অন্তত ৬ মাস আগে আপনার ক্রেডিট স্কোর চেক করুন। যদি কম থাকে, তবে সময়মতো সমস্ত বিল পেমেন্ট করে এবং পুরনো লোন মিটিয়ে স্কোর ভালো করার চেষ্টা করুন।
২. ডাউন পেমেন্ট এবং EMI-এর সামর্থ্য (Budgeting)
লোন নেওয়ার আগে আপনাকে দুটি বড় অঙ্কের টাকার হিসাব করতে হবে:
- ডাউন পেমেন্ট (Down Payment): ব্যাঙ্ক আপনাকে বাড়ির মোট মূল্যের ১০০% লোন দেয় না। আপনাকে সাধারণত ১০% থেকে ২০% টাকা নিজের পকেট থেকে দিতে হয়, একেই ডাউন পেমেন্ট বলে। অর্থাৎ, ৫০ লক্ষ টাকার বাড়ির জন্য আপনাকে ৫ থেকে ১০ লক্ষ টাকা নগদ প্রস্তুত রাখতে হবে।
- EMI (মাসিক কিস্তি): এটিই সেই অঙ্ক যা আপনাকে প্রতি মাসে শোধ করতে হবে।
সোনালী নিয়ম (Golden Rule): কোনো অবস্থাতেই আপনার মাসিক হোম লোনের EMI যেন আপনার মোট মাসিক আয়ের (Take-home salary) ৪০% থেকে ৫০% -এর বেশি না হয়। মনে রাখবেন, লোন পাওয়ার পরও আপনাকে বাড়ি চালানো, অন্যান্য খরচ এবং নিজের সঞ্চয় চালিয়ে যেতে হবে।
৩. শুধু লোন নয়, “লুকানো খরচ” গুলি কী কী?
একটি বাড়ি কেনার খরচ শুধু তার দাম এবং লোনের সুদেই সীমাবদ্ধ নয়। এর সাথে আরও অনেক “লুকানো খরচ” (Hidden Costs) জড়িত, যা বেশিরভাগ মানুষ হিসাবের মধ্যে ধরে না। এই খরচগুলোর জন্য আপনাকে আলাদাভাবে টাকা জমাতে হবে, কারণ ব্যাঙ্ক সাধারণত এই খরচগুলোর জন্য লোন দেয় না।
যেমন:
- প্রসেসিং ফি (Processing Fee): ব্যাঙ্ক আপনার লোন প্রক্রিয়া করার জন্য একটি ফি নেয় (লোনের পরিমাণের ০.৫% থেকে ১%)।
- স্ট্যাম্প ডিউটি (Stamp Duty): এটি রাজ্য সরকারকে দেওয়া একটি ট্যাক্স, যা সম্পত্তির মূল্যের একটি বড় অংশ (যেমন ৫-৭%) হতে পারে।
- রেজিস্ট্রেশন ফি (Registration Fee): সম্পত্তি আপনার নামে রেজিস্ট্রি করার খরচ।
- GST: আপনি যদি কোনো নির্মীয়মাণ (Under-construction) ফ্ল্যাট কেনেন, তবে আপনাকে GST দিতে হবে।
- আইনি এবং ভ্যালুয়েশন ফি: ব্যাঙ্কের উকিল এবং ইঞ্জিনিয়াররা সম্পত্তিটি যাচাই করার জন্য একটি ফি নেন।
কী করবেন: আপনার বাড়ির বাজেটে, সম্পত্তির মূল দামের ওপর অতিরিক্ত ৮% থেকে ১৫% এই লুকানো খরচগুলোর জন্য ধরে রাখুন।
৪. সুদের হার: ফিক্সড (Fixed) না ফ্লোটিং (Floating)?
এটি হোম লোনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে একটি।
- ফিক্সড রেট (Fixed Rate): এখানে আপনার লোনের সুদের হার পুরো মেয়াদের জন্য একই থাকে। অর্থাৎ, বাজার বা RBI-এর রেট বাড়লেও আপনার EMI বাড়বে না, কমলেও কমবে না। এটি আপনাকে একটি স্থিতিশীলতা দেয়, তবে ফিক্সড রেট সাধারণত ফ্লোটিং রেটের চেয়ে ১% থেকে ২% বেশি হয়।
- ফ্লোটিং রেট (Floating Rate): এটি বাজারের সাথে ওঠানামা করে। RBI যখন রেপো রেট বাড়ায়, আপনার সুদের হার (এবং EMI) বেড়ে যায়; যখন কমায়, তখন কমে যায়। এটি সাধারণত শুরুতে সস্তা হয়, তবে এতে অনিশ্চয়তা থাকে।
কোনটি বাছবেন? বর্তমানে বেশিরভাগ ব্যাঙ্কই ফ্লোটিং রেট লোন দিতে পছন্দ করে। যদি আপনি স্থিতিশীলতা চান এবং ঝুঁকি এড়াতে চান, তবে ফিক্সড রেট ভালো। কিন্তু যদি আপনি মনে করেন ভবিষ্যতে সুদের হার কমতে পারে এবং আপনি কিছুটা ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত, তবে ফ্লোটিং রেট লাভজনক হতে পারে।
৫. লোনের মেয়াদ (Tenure): কম EMI-এর ফাঁদ
ব্যাঙ্ক আপনাকে প্রায়শই দীর্ঘতম মেয়াদের (যেমন ৩০ বছর) লোন নিতে উৎসাহিত করবে। এর কারণ হলো, এতে আপনার মাসিক EMI-এর পরিমাণ অনেক কমে যায়।
কিন্তু এটি একটি বড় ফাঁদ।
আসুন একটি উদাহরণ দেখি (প্রায়):
ধরুন, আপনি ৫০ লক্ষ টাকার লোন ৮.৫% সুদে নিলেন।
- কেস ১: ৩০ বছরের মেয়াদ
- মাসিক EMI: প্রায় ৩৮,৪০০ টাকা
- মোট সুদ দেবেন: প্রায় ৮৮.৩ লক্ষ টাকা (আসলের চেয়েও বেশি!)
- কেস ২: ২০ বছরের মেয়াদ
- মাসিক EMI: প্রায় ৪৩,৪০০ টাকা (মাত্র ৫,০০০ টাকা বেশি)
- মোট সুদ দেবেন: প্রায় ৫৪.১ লক্ষ টাকা
ফলাফল: আপনি যদি প্রতি মাসে মাত্র ৫,০০০ টাকা বেশি ম্যানেজ করতে পারেন, তবে আপনি ১০ বছর আগে ঋণমুক্ত হয়ে যাবেন এবং প্রায় ৩৪ লক্ষ টাকা সুদ বাঁচিয়ে ফেলবেন!
কী করবেন: সর্বদা চেষ্টা করুন যতটা সম্ভব কম মেয়াদের লোন নিতে, যা আপনি আরামে শোধ করতে পারবেন। EMI কম রাখার লোভে পড়ে নিজের ঋণের বোঝা বাড়িয়ে তুলবেন না।
শেষ কথা
একটি হোম লোন আপনার জীবনের স্বপ্ন পূরণের চাবিকাঠি হতে পারে, যদি তা সঠিকভাবে পরিকল্পনা করা হয়। এটি কোনো দৌড় প্রতিযোগিতা নয়।
লোন নেওয়ার আগে সময় নিন, নিজের CIBIL স্কোর পরীক্ষা করুন, বাজেটের প্রতিটি পয়সা হিসাব করুন এবং বিভিন্ন ব্যাঙ্কের অফার তুলনা করুন। একটি সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত আপনাকে আগামী ২০-৩০ বছর আর্থিকভাবে সুরক্ষিত এবং চাপমুক্ত রাখবে।

