ক্রেডিট কার্ডের ঋণে জর্জরিত? ঋণমুক্ত হওয়ার ৩টি পরীক্ষিত কৌশল (ডেট স্নোবল মেথড)

পূজা বা দীপাবলির উৎসবের মরশুম শেষ হয়েছে। নতুন জামাকাপড়, গ্যাজেট কেনা, বা ফাইভ-স্টার হোটেলে ডিনার—সবকিছুই খুব আনন্দের ছিল। কিন্তু উৎসবের আলো নিভতেই আসল অন্ধকারটা নেমে এসেছে আপনার ক্রেডিট কার্ডের বিলের মেসেজে।

আপনার ক্রেডিট কার্ডের বিল কি আপনার মাসিক বেতনের চেয়েও বেশি হয়ে গেছে? আপনি কি প্রতি মাসে শুধু ‘Minimum Due’ দিয়ে কোনোমতে মানসম্মান বাঁচাচ্ছেন?

বিশ্বাস করুন, আপনি একা নন। ভারতের লক্ষ লক্ষ মধ্যবিত্ত মানুষ এখন ক্রেডিট কার্ডের ঋণের চক্রব্যূহে আটকে আছেন। এই ঋণ এমন এক আঠালো জাল, যেখানে একবার পা দিলে বের হওয়া কঠিন। ক্রেডিট কার্ডের সুদ (যা বার্ষিক ৩৬-৪৮% পর্যন্ত হতে পারে) আপনার আর্থিক মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে পারে।

কিন্তু হাল ছাড়বেন না। “Glance Today”-এর আজকের ব্লগে আমরা এমন ৩টি বৈজ্ঞানিক এবং পরীক্ষিত কৌশল নিয়ে আলোচনা করব, যা আপনাকে এই ঋণের পাহাড় থেকে বের করে আনবে এবং আবার আপনাকে মাথা উঁচু করে বাঁচতে সাহায্য করবে।

কেন ক্রেডিট কার্ডের ঋণ সবচেয়ে বিপদজনক?

সমাধানে যাওয়ার আগে সমস্যাটা বুঝুন। হোম লোন বা কার লোনের সুদের হার হয় ৮-১০%। কিন্তু ক্রেডিট কার্ডের সুদের হার বার্ষিক ৪০-৪৮% পর্যন্ত হতে পারে!

অর্থাৎ, আপনি যদি ১ লক্ষ টাকা ঋণ রাখেন এবং শোধ না করেন, তবে ১ বছর পর সেটি ১.৫ লক্ষ টাকা হয়ে যাবে। এটি হলো কম্পাউন্ডিং-এর উল্টো পিঠ—যা আপনাকে ধনী না করে বরং নিঃস্ব করে।

ঋণমুক্ত হওয়ার ৩টি পরীক্ষিত কৌশল

ঋণ শোধ করা শুধু অঙ্কের খেলা নয়, এটি মনস্তত্ত্ব বা সাইকোলজির খেলা। বিশ্বের সেরা ফিনান্সিয়াল এক্সপার্টরা এই তিনটি পদ্ধতি সুপারিশ করেন:

১. ডেট স্নোবল মেথড (Debt Snowball Method) – ছোট থেকে শুরু

এটি ঋণ শোধ করার সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং মানসিকভাবে তৃপ্তিদায়ক পদ্ধতি। বিখ্যাত আমেরিকান ফিনান্স গুরু ডেভ র‍্যামসে (Dave Ramsey) এই পদ্ধতির জনক।

কীভাবে কাজ করে: বরফের ছোট টুকরো (Snowball) পাহাড়ের ওপর থেকে গড়িয়ে দিলে যেমন নিচে আসতে আসতে বিশাল আকার ধারণ করে, এটিও ঠিক তাই।

  • ধাপ ১: আপনার সমস্ত ঋণ বা ক্রেডিট কার্ডের বিলের তালিকা তৈরি করুন—সবচেয়ে ছোট পরিমাণ থেকে সবচেয়ে বড়। (সুদের হার দেখার দরকার নেই)।
  • ধাপ ২: সব কার্ডের মিনিমাম পেমেন্ট দিন, যাতে পেনাল্টি না লাগে।
  • ধাপ ৩: আপনার হাতে থাকা সমস্ত বাড়তি টাকা দিয়ে সবচেয়ে ছোট ঋণটি সবার আগে পুরো শোধ করে দিন।
  • ফলাফল: যখন আপনি দেখবেন একটি কার্ডের বিল শূন্য হয়ে গেছে, তখন আপনি যে মানসিক শক্তি (Quick Win) পাবেন, তা আপনাকে পরের বড় ঋণটি শোধ করতে উৎসাহ দেবে।

২. ডেট অ্যাভাল্যাঞ্চ মেথড (Debt Avalanche Method) – গণিতের জয়

আপনি যদি আবেগের চেয়ে গণিত এবং যুক্তিকে বেশি গুরুত্ব দেন, তবে এই পদ্ধতি আপনার জন্য। এটি আপনাকে সবচেয়ে বেশি টাকা সাশ্রয় করবে।

কীভাবে কাজ করে: এখানে ঋণের পরিমাণ নয়, সুদের হার (Interest Rate) দেখা হয়।

  • ধাপ ১: আপনার ঋণগুলোকে সাজান—সবচেয়ে বেশি সুদের হার থেকে সবচেয়ে কম
  • ধাপ ২: যেই কার্ডে সবচেয়ে বেশি সুদ দিতে হচ্ছে (যেমন ৪২%), সেটিকে সবার আগে টার্গেট করুন।
  • ধাপ ৩: বাকিদের মিনিমাম পেমেন্ট দিন এবং এই হাই-ইন্টারেস্ট ঋণটি আগে শেষ করুন।
  • ফলাফল: এতে ঋণ শোধ হতে শুরুতে একটু সময় লাগতে পারে (যদি বড় ঋণটি হাই ইন্টারেস্টের হয়), কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে আপনি হাজার হাজার টাকা সুদ বাঁচাবেন।

৩. ব্যালেন্স ট্রান্সফার বা কনসলিডেশন (Debt Consolidation)

আপনার যদি একাধিক ক্রেডিট কার্ড থাকে এবং সবগুলোর বিল আকাশছোঁয়া হয়, তবে এই পদ্ধতিটি আপনার জীবন বাঁচাতে পারে।

কীভাবে কাজ করে: ধরুন, আপনার ৩টি কার্ডে মোট ২ লক্ষ টাকা ঋণ আছে এবং আপনি গড়ে ৪০% সুদ দিচ্ছেন।

  • উপায়: আপনি ব্যাংকে গিয়ে একটি পার্সোনাল লোন (Personal Loan) নিন। পার্সোনাল লোনের সুদ সাধারণত ১২-১৪% হয়।
  • অ্যাকশন: সেই লোনের টাকা দিয়ে ৩টি কার্ডের পুরো ঋণ একবারে শোধ করে দিন।
  • লাভ: এখন আপনার আর ৩টি কার্ডের ৪০% সুদ দিতে হবে না। আপনাকে শুধু একটি পার্সোনাল লোনের ১৪% সুদ দিতে হবে। এতে আপনার মাসিক ইএমআই (EMI) কমে যাবে এবং মানসিক চাপও কমবে।

ঋণমুক্ত হওয়ার পর কী করবেন? (সতর্কতা)

ঋণ শোধ করা মানে যুদ্ধ জয় করা। কিন্তু যুদ্ধ জয়ের পর শান্তি বজায় রাখাটাই আসল চ্যালেঞ্জ।

১. কার্ড কেটে ফেলুন: যে কার্ডটি আপনাকে বিপদে ফেলেছিল, ঋণ শোধ করার পর সেটিকে বাতিল করুন বা লিমিট কমিয়ে দিন। ২. ইমার্জেন্সি ফান্ড তৈরি করুন: যাতে ভবিষ্যতে টাকার দরকার হলে আর কার্ড ঘষতে না হয়। ৩. বাজেট তৈরি করুন: ৫০-৩০-২০ রুল মেনে চলুন এবং সাধ্যের বাইরে খরচ করা বন্ধ করুন।

শেষ কথা

ঋণের বোঝা নিয়ে রাতে ঘুমানো কতটা কষ্টের, তা ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ জানে না। কিন্তু মনে রাখবেন, এই পরিস্থিতি চিরস্থায়ী নয়।

আজই খাতা-কলম নিয়ে বসুন। আপনার ঋণের তালিকা তৈরি করুন এবং ওপরের ৩টি পদ্ধতির মধ্যে যেটি আপনার জন্য উপযুক্ত, সেটি বেছে নিয়ে কাল থেকেই কাজ শুরু করুন।

স্বাধীনতা খুব কাছেই অপেক্ষা করছে। শুভকামনা!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top