২০২৬ সালে কোন মিউচুয়াল ফান্ডে SIP শুরু করবেন? সেরা ৫টি ফান্ডের তালিকা
২০২৫ সাল প্রায় শেষের পথে। আর মাত্র কয়েকটা দিন, তারপরেই ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে আসবে ২০২৬ সাল। নতুন বছর মানেই নতুন আশা, নতুন স্বপ্ন এবং অবশ্যই—নতুন আর্থিক পরিকল্পনা।
আপনি কি এই বছর আপনার বিনিয়োগ শুরু করার কথা ভাবছেন? নাকি পুরনো পোর্টফোলিওকে নতুন করে সাজাতে চাইছেন? ভারতের শেয়ার বাজার বর্তমানে এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। সেনসেক্স এবং নিফটি নতুন উচ্চতা স্পর্শ করছে। এই পরিস্থিতিতে ২০২৬ সালটি দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি “সুবর্ণ সুযোগ” হতে পারে।
কিন্তু সমস্যা হলো, বাজারে হাজার হাজার মিউচুয়াল ফান্ডের ভিড়ে সঠিক ফান্ডটি খুঁজে বের করা খড়ের গাদায় সূঁচ খোঁজার মতো। কোনটি ভালো? কোনটি নিরাপদ? কোনটিতে রিটার্ন বেশি?
আমরা গভীর বিশ্লেষণ করে ২০২৬ সালের জন্য সেরা ৫টি মিউচুয়াল ফান্ডের তালিকা তৈরি করেছি, যা আপনার সম্পদ তৈরির যাত্রাকে সহজ করবে।
কেন ২০২৬ সাল বিনিয়োগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ?
ভারতের অর্থনীতি এখন বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি। ২০২৬-২৭ সালের মধ্যে ভারত ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হওয়ার পথে এগোচ্ছে।
- বুল রান (Bull Run): বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আগামী ৫-১০ বছর ভারতের শেয়ার বাজারের জন্য “গোল্ডেন পিরিয়ড”।
- কম্পাউন্ডিং-এর সুবিধা: আপনি যদি ২০২৬-এর জানুয়ারিতে বিনিয়োগ শুরু করেন, তবে ২০৩৫ বা ২০৪০ সালে গিয়ে আপনি যে সম্পদ তৈরি করবেন, তা আজকের কল্পনার বাইরে।
তাই আর দেরি না করে, আসুন দেখে নিই আপনার পোর্টফোলিওতে কোন কোন ফান্ড থাকা উচিত।
আমরা কীভাবে সেরা ফান্ড বেছে নিয়েছি? (Selection Criteria)
আমরা শুধু গত ১ বছরের রিটার্ন দেখে ফান্ড নির্বাচন করিনি। আমাদের প্যারামিটারগুলো হলো: ১. ধারাবাহিকতা (Consistency): ফান্ডটি গত ৫-১০ বছর ধরে কেমন পারফর্ম করেছে। ২. ফান্ড ম্যানেজার: কে আপনার টাকা পরিচালনা করছেন এবং তার অভিজ্ঞতা। ৩. এক্সপেন্স রেশিও (Expense Ratio): খরচ যত কম, আপনার লাভ তত বেশি। ৪. রিস্ক ম্যানেজমেন্ট: বাজার পরলে ফান্ডটি কতটা কম পরে।
২০২৬-এর জন্য সেরা ৫টি এসআইপি (ক্যাটাগরি অনুযায়ী)
বিনিয়োগের সুবর্ণ নিয়ম হলো—“সব টাকা এক জায়গায় রাখবেন না”। তাই আমরা বিভিন্ন ক্যাটাগরি থেকে সেরা ফান্ডগুলো বেছে নিয়েছি।
১. লার্জ ক্যাপ/ইনডেক্স ফান্ড (নিরাপদ এবং স্থিতিশীল)
ফান্ডের নাম: UTI Nifty 50 Index Fund
যারা ঝুঁকি নিতে ভয় পান এবং বাজারের সমান রিটার্ন চান, তাদের জন্য এটি সেরা।
- কেন বাছবেন: এটি ভারতের সেরা ৫০টি কোম্পানি (যেমন Reliance, TCS, HDFC Bank)-এ টাকা খাটায়। এটি একটি প্যাসিভ ফান্ড, তাই এর খরচ (Expense Ratio) অত্যন্ত কম (মাত্র ০.২% এর আশেপাশে)।
- কাদের জন্য: নতুন বিনিয়োগকারী যারা দীর্ঘমেয়াদে ১২-১৩% নিশ্চিত রিটার্ন চান।
২. ফ্লেক্সি ক্যাপ ফান্ড (অলরাউন্ডার)
ফান্ডের নাম: Parag Parikh Flexi Cap Fund
এটি ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় এবং বিশ্বস্ত ফান্ড।
- কেন বাছবেন: এই ফান্ডের বিশেষত্ব হলো ফান্ড ম্যানেজার নিজের ইচ্ছামতো লার্জ ক্যাপ, মিড ক্যাপ বা স্মল ক্যাপে টাকা খাটাতে পারেন। এমনকি এই ফান্ডটি বিদেশি কোম্পানি (যেমন Microsoft, Alphabet)-তেও বিনিয়োগ করে (বর্তমানে লিমিট থাকলেও)। এর “ভ্যালু ইনভেস্টিং” কৌশল একে বাজারের পতনের সময়ও রক্ষা করে।
- প্রত্যাশিত রিটার্ন: ১৫-১৮% (দীর্ঘমেয়াদে)।
৩. মিড ক্যাপ ফান্ড (ব্যালেন্সড গ্রোথ)
ফান্ডের নাম: Motilal Oswal Midcap Fund
আগামী দিনের লার্জ ক্যাপ কোম্পানিগুলো আজ মিড ক্যাপে আছে। এখানেই গ্রোথ সবচেয়ে বেশি।
- কেন বাছবেন: মতিলাল অসওয়াল গ্রুপ তাদের “QGLP” (Quality, Growth, Longevity, Price) ফিলোসফির জন্য বিখ্যাত। এই ফান্ডটি গত ৩-৫ বছরে অবিশ্বাস্য রিটার্ন দিয়েছে। ফান্ড ম্যানেজাররা উচ্চ মানের কোম্পানি বাছতে খুব দক্ষ।
- কাদের জন্য: যারা একটু ঝুঁকি নিয়ে ২০% এর বেশি রিটার্ন আশা করেন এবং অন্তত ৭ বছর সময় দিতে পারবেন।
৪. স্মল ক্যাপ ফান্ড (হাই রিস্ক, হাই রিওয়ার্ড)
ফান্ডের নাম: Nippon India Small Cap Fund
যদি আপনি তরুণ হন এবং আপনার হাতে ১০-১৫ বছর সময় থাকে, তবে স্মল ক্যাপ ফান্ড আপনাকে কোটিপতি বানাতে পারে।
- কেন বাছবেন: এটি এই ক্যাটাগরির “বস”। হাজার হাজার কোটি টাকার সাইজ হওয়া সত্ত্বেও এটি ধারাবাহিকভাবে ভালো রিটার্ন দিয়ে যাচ্ছে। ফান্ড ম্যানেজার সমীর রাচ এই ফান্ডটিকে খুব দক্ষতার সাথে পরিচালনা করেন। এটি ছোট ছোট কোম্পানিতে বিনিয়োগ করে যা ভবিষ্যতে মাল্টিব্যাগার হতে পারে।
- সতর্কতা: এখানে টাকা ১ বছরে ২০% কমেও যেতে পারে। তাই দুর্বল হার্টের জন্য এটি নয়।
৫. ট্যাক্স সেভিং ফান্ড (ELSS)
ফান্ডের নাম: Quant ELSS Tax Saver Fund
ট্যাক্স বাঁচানো এবং সম্পদ তৈরি—এক ঢিলে দুই পাখি।
- কেন বাছবেন: Quant মিউচুয়াল ফান্ড বর্তমানে তাদের অ্যালগরিদম-ভিত্তিক এবং ডেটা-ড্রিভেন স্টাইল দিয়ে বাজিমাত করছে। তাদের ELSS ফান্ডটি ক্যাটাগরির সেরা পারফর্মারদের একটি। এটি সেকশন 80C-এর অধীনে ১.৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ট্যাক্স ছাড় দেয়।
- লক-ইন: ৩ বছর টাকা তোলা যায় না।
২০২৬-এর জন্য একটি আদর্শ পোর্টফোলিও (উদাহরণ)
ধরুন আপনি মাসে ১০,০০০ টাকা বিনিয়োগ করতে চান। আপনি টাকাটা এভাবে ভাগ করতে পারেন:
| ফান্ডের ধরন | টাকার পরিমাণ | উদ্দেশ্য |
|---|---|---|
| Index Fund | ৩,০০০ টাকা | স্থিতিশীলতা (Core Portfolio) |
| Flexi Cap | ৩,০০০ টাকা | বৈচিত্র্য এবং ব্যালেন্স |
| Mid Cap | ২,০০০ টাকা | গ্রোথ |
| Small Cap | ২,০০০ টাকা | অতিরিক্ত লাভ (Alpha Generation) |
এসআইপি (SIP) করার সময় ৩টি টিপস
১. স্টেপ-আপ এসআইপি (Step-Up SIP): ২০২৬ সালে আপনার বেতন বা আয় বাড়লে এসআইপি-র পরিমাণও অন্তত ১০% বাড়ান। এটি আপনার লক্ষ্যের সময়সীমা অর্ধেক করে দিতে পারে। ২. মার্কেট ক্র্যাশকে ভয় পাবেন না: বাজার যখন পড়বে, তখন এসআইপি বন্ধ করবেন না। বরং পারলে তখন আরও কিছু টাকা (Lumpsum) ঢালুন। কারণ কম দামে বেশি ইউনিট কেনা যায়। ৩. রিভিউ করুন: বছরে একবার (ডিসেম্বর বা জানুয়ারিতে) আপনার পোর্টফোলিও রিভিউ করুন। কিন্তু ঘন ঘন ফান্ড পাল্টাবেন না।
শেষ কথা
২০২৬ সাল আপনার আর্থিক স্বাধীনতার যাত্রাপথের ভিত্তিপ্রস্তর হতে পারে। ওপরের ফান্ডগুলো বর্তমান সময়ের সেরা পারফর্মার, কিন্তু মিউচুয়াল ফান্ডে “অতীতের পারফরম্যান্স ভবিষ্যতের গ্যারান্টি দেয় না”।
তাই বিনিয়োগ শুরু করার আগে নিজের ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা বুঝুন এবং প্রয়োজনে একজন সার্টিফাইড আর্থিক উপদেষ্টার (Financial Advisor) পরামর্শ নিন।
আপনার নতুন বছরের বিনিয়োগ যাত্রা সফল হোক!
(Disclaimer: Mutual Fund investments are subject to market risks. Please read all scheme-related documents carefully before investing.)







