ধনীরা কীভাবে লোন ব্যবহার করে আরও ধনী হয়? (ঋণের গোপন রহস্য)

সাধারণ মানুষের কাছে লোন বা ঋণ হলো একটি বোঝার মতো। আমরা লোন নিই অভাব মেটাতে বা বিলাসিতা করতে, যা আমাদের পকেট থেকে টাকা বের করে নেয়। কিন্তু ধনীরা লোন নেন টাকা বানানোর জন্য।

রবার্ট কিয়োসাকি (Rich Dad Poor Dad-এর লেখক) থেকে শুরু করে মুকেশ আম্বানি—বিশ্বের তাবড় ধনীরা তাদের সাম্রাজ্য গড়েছেন ঋণের ওপর দাঁড়িয়ে। তারা ব্যাংকের টাকা ব্যবহার করে নিজেরা ধনী হন।

আজকের ব্লগে আমরা সেই গোপন কৌশল বা “Financial Leverage” নিয়ে আলোচনা করব।

১. ‘গুড ডেট’ বনাম ‘ব্যাড ডেট’ (Good Debt vs. Bad Debt)

ধনীরা ঋণ নেওয়ার আগে একটি সহজ সমীকরণ মেলান: এই ঋণ কি আমার পকেটে টাকা আনবে, নাকি বের করবে?

  • ব্যাড ডেট (খারাপ ঋণ): আপনি লোন নিয়ে গাড়ি কিনলেন বা ছুটিতে গেলেন। এর কোনো রিটার্ন নেই, উল্টো আপনাকে সুদ দিতে হচ্ছে। এটি আপনাকে গরীব করে।
  • গুড ডেট (ভালো ঋণ): আপনি লোন নিয়ে একটি কমার্শিয়াল স্পেস কিনলেন বা ব্যবসায় মেশিন কিনলেন। সেই স্পেসের ভাড়া বা মেশিনের উৎপাদিত পণ্য থেকে যা আয় হবে, তা দিয়ে লোনের কিস্তি শোধ হবে এবং বাকিটা আপনার লাভ।

২. OPM বা অন্যের টাকায় ব্যবসা (Other People’s Money)

এটি ধনীদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। নিজের টাকা খরচ না করে ব্যাংকের টাকা (OPM) ব্যবহার করে সম্পদ কেনা।

উদাহরণ: ধরুন, একটি ১০ কোটি টাকার প্রজেক্টে ২০% লাভ হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

  • সাধারণ বিনিয়োগকারী: নিজের ১০ কোটি টাকা দিয়ে প্রজেক্টটি করবেন। লাভ হবে ২ কোটি টাকা। (রিটার্ন ২০%)।
  • স্মার্ট ধনী বিনিয়োগকারী: নিজের মাত্র ২ কোটি টাকা দেবেন এবং বাকি ৮ কোটি টাকা ব্যাংক থেকে লোন নেবেন (ধরুন ১০% সুদে)।
    • মোট লাভ: ২ কোটি টাকা।
    • ব্যাংককে সুদ দিতে হবে: ৮ কোটি টাকার ১০% = ৮০ লক্ষ টাকা।
    • নিট লাভ: ২ কোটি – ৮০ লক্ষ = ১ কোটি ২০ লক্ষ টাকা।

মজার বিষয়: তিনি পকেট থেকে লাগিয়েছিলেন মাত্র ২ কোটি টাকা, আর লাভ করলেন ১.২০ কোটি টাকা

  • তার রিটার্ন: ৬০%! (যেখানে সাধারণ বিনিয়োগকারীর রিটার্ন মাত্র ২০%)।

এটিই হলো লিভারেজ (Leverage)-এর জাদু।

break even point or BEP or Cost volume profit graph of the sales units and the revenue sales with margin of safety

৩. লোন মানেই ট্যাক্স ফ্রি টাকা (Tax Benefits)

ধনীরা লোন নিতে পছন্দ করেন কারণ ঋণের টাকা ট্যাক্স-ফ্রি। আপনি যখন পরিশ্রম করে ১ কোটি টাকা আয় করেন, তখন সরকারকে ৩০% বা তার বেশি ট্যাক্স দিতে হয়। কিন্তু আপনি যখন ব্যাংকের কাছ থেকে ১০ কোটি টাকা লোন নেন, তখন সেই টাকার ওপর কোনো ট্যাক্স দিতে হয় না।

তাছাড়া, ব্যবসার জন্য নেওয়া লোনের সুদকে “খরচ” (Expense) হিসেবে দেখানো যায়, যা আপনার ব্যবসার ট্যাক্সযোগ্য আয় (Taxable Income) কমিয়ে দেয়। অর্থাৎ, লোন নিলে ট্যাক্স বাঁচে!

৪. মুদ্রাস্ফীতির সুবিধা নেওয়া (Inflation Hedge)

ধনীরা জানেন যে সময়ের সাথে টাকার মান কমে। ধরুন, আপনি আজ ১ কোটি টাকা লোন নিলেন এবং ১০ বছর ধরে তা শোধ করবেন। ১০ বছর পর মুদ্রাস্ফীতির কারণে ওই ১ কোটি টাকার বা কিস্তির টাকার আসল মূল্য (Real Value) অনেক কমে যাবে। কিন্তু আপনি যে সম্পদটি (যেমন জমি বা ফ্ল্যাট) কিনেছিলেন, তার দাম বেড়ে যাবে।

অর্থাৎ, আপনি ব্যাংককে শোধ করছেন “কম দামি” টাকায়, আর মালিক হচ্ছেন “বেশি দামি” সম্পদের।

সতর্কতা: এটি সবার জন্য নয়

এই কৌশলগুলো শুনতে দারুণ লাগলেও, এগুলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ধনীরা এগুলো করতে পারেন কারণ: ১. তাদের লোন শোধ করার মতো পর্যাপ্ত ক্যাশ ফ্লো (Cash Flow) বা আয়ের উৎস থাকে। ২. তারা দক্ষ আর্থিক উপদেষ্টার সাহায্য নেন।

উপদেশ: লোন নিয়ে বিলাসী পণ্য কিনবেন না। যদি লোন নিতেই হয়, তবে তা এমন জায়গায় খাটান যা লোনের সুদের চেয়ে বেশি আয় জেনারেট করবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top