ঋণমুক্ত হওয়ার সেরা ৫ উপায়: মানসিক শান্তি ফিরে পাওয়ার গাইড

ঋণ বা লোন (Debt) হলো এমন এক অতিথি, যে একবার ঘরে ঢুকলে আর বের হতে চায় না। মাস শেষে বেতনের মেসেজ আসার আগেই ইএমআই (EMI) কাটার মেসেজ চলে আসে। এই চক্রে একবার ফেঁসে গেলে মনে হয় জীবনটা বুঝি শুধুই কিস্তি শোধ করার জন্য।

ঋণ শুধু আপনার পকেট খালি করে না, এটি আপনার মানসিক শান্তিও কেড়ে নেয়। কিন্তু চিন্তার কিছু নেই। সঠিক পরিকল্পনা এবং একটু শৃঙ্খলার মাধ্যমে আপনি পাহাড়সমান ঋণ থেকেও মুক্তি পেতে পারেন।

“Glance Today”-এর আজকের ব্লগে আমরা আলোচনা করব ঋণমুক্ত হওয়ার বৈজ্ঞানিক এবং পরীক্ষিত ৫টি সেরা উপায়।

১. ডেট স্নোবল মেথড (Debt Snowball Method)

এটি ঋণ পরিশোধের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং মনস্তাত্ত্বিক পদ্ধতি। বিখ্যাত আর্থিক বিশেষজ্ঞ ডেভ র‍্যামসে (Dave Ramsey) এই পদ্ধতির প্রবক্তা।

কীভাবে কাজ করে: আপনার সমস্ত ঋণের একটি তালিকা তৈরি করুন—সবচেয়ে ছোট পরিমাণ থেকে সবচেয়ে বড়। সুদের হারের দিকে তাকানোর দরকার নেই।

  1. সবার আগে আপনার সবচেয়ে ছোট ঋণটি টার্গেট করুন।
  2. বাকি সব ঋণের শুধু মিনিমাম পেমেন্ট দিন।
  3. আপনার সমস্ত অতিরিক্ত টাকা দিয়ে ওই ছোট ঋণটি শোধ করে দিন।

ফলাফল: যখন আপনি দ্রুত একটি ঋণ শোধ করে ফেলবেন, তখন আপনি যে মানসিক প্রশান্তি এবং আত্মবিশ্বাস পাবেন (Quick Win), তা আপনাকে পরের ঋণটি শোধ করতে উৎসাহ দেবে। এভাবেই ছোট বরফের টুকরো গড়িয়ে বড় স্নোবলে পরিণত হয়।

২. ডেট অ্যাভাল্যাঞ্চ মেথড (Debt Avalanche Method)

আপনি যদি গণিত এবং যুক্তিতে বিশ্বাসী হন, তবে এই পদ্ধতিটি আপনার জন্য সেরা। এটি আপনার সবচেয়ে বেশি টাকা সাশ্রয় করবে।

কীভাবে কাজ করে: এখানে আপনি ঋণের পরিমাণ নয়, বরং সুদের হার (Interest Rate) দেখবেন।

  1. যেই ঋণের সুদের হার সবচেয়ে বেশি (যেমন ক্রেডিট কার্ডের বিল বা পার্সোনাল লোন), সেটিকে সবার আগে শোধ করুন।
  2. কারণ এই ঋণগুলোই আপনার পকেট সবচেয়ে বেশি কাটছে।

ফলাফল: যদিও এই পদ্ধতিতে ঋণ শোধ হতে একটু সময় লাগতে পারে (যদি বড় ঋণের সুদ বেশি হয়), কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে আপনি অনেক কম সুদ দেবেন এবং দ্রুত ঋণমুক্ত হবেন।

৩. বাজেট এবং লাইফস্টাইল পরিবর্তন

ঋণ শোধ করার জন্য আপনার হাতে বাড়তি টাকা থাকা চাই। আর বাড়তি টাকা আসবে খরচ কমিয়ে।

  • ৫০/৩০/২০ নিয়ম সাময়িকভাবে বন্ধ করুন: ঋণ থাকা অবস্থায় আপনার কোনো ‘শখ’ (Wants) থাকা উচিত নয়। শুধুমাত্র প্রয়োজন (Needs) এবং ঋণ পরিশোধ—এই দুটিতেই ফোকাস করুন।
  • অপ্রয়োজনীয় খরচ ছাঁটাই: নেটফ্লিক্স সাবস্ক্রিপশন, বাইরে খাওয়া, বা দামী কফি—ঋণ শোধ না হওয়া পর্যন্ত এগুলো বন্ধ রাখুন।
  • মিনিমালিস্ট হোন: আপনার যা প্রয়োজন নেই, তা কিনবেন না। মনে রাখবেন, আপনি এখন একটি ‘আর্থিক যুদ্ধে’ আছেন।

৪. ঋণ একত্রীকরণ (Debt Consolidation)

আপনার যদি অনেকগুলো ছোট ছোট ঋণ থাকে এবং সেগুলোর সুদের হার খুব বেশি হয় (যেমন একাধিক ক্রেডিট কার্ডের বিল), তবে এই পদ্ধতিটি কাজে লাগাতে পারেন।

কীভাবে কাজ করে: আপনি ব্যাংক থেকে একটি বড় পার্সোনাল লোন নিন (তুলনামূলক কম সুদে) এবং সেই টাকা দিয়ে আপনার সমস্ত ছোট ও চড়া সুদের ঋণগুলো একবারে শোধ করে দিন।

সুবিধা:

  1. আপনাকে ১০ জায়গায় ইএমআই দিতে হবে না, মাত্র ১টি ইএমআই দিতে হবে।
  2. সুদের হার গড়ে কমে আসবে।
  3. মানসিক চাপ কমবে।

সতর্কতা: এটি করার পর যদি আপনি আবার নতুন করে ক্রেডিট কার্ডে খরচ শুরু করেন, তবে আপনি আরও বড় বিপদে পড়বেন।

৫. আয় বৃদ্ধি (Side Hustle)

খরচ কমানোর একটি সীমা আছে, কিন্তু আয় বাড়ানোর কোনো সীমা নেই। ঋণ দ্রুত শোধ করার জন্য আপনার আয়ের চাকা বড় করতে হবে।

  • ওভারটাইম বা ফ্রিল্যান্সিং: আপনার দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে কাজের বাইরে কিছু বাড়তি কাজ করুন।
  • অব্যবহৃত জিনিস বিক্রি: ঘরে পড়ে থাকা পুরনো ফোন, আসবাবপত্র বা জামাকাপড় বিক্রি করে দিন। যা টাকা আসবে, তা সরাসরি ঋণের কিস্তিতে জমা দিন।
  • বোনাস ব্যবহার: অফিস থেকে বোনাস বা উপহার পেলে তা দিয়ে পার্টি না করে ঋণ শোধ করুন।

শেষ কথা: আজই শুরু করুন

ঋণমুক্ত হওয়া কোনো জাদুর বিষয় নয়। এটি একটি ম্যারাথন দৌড়। মাঝপথে ক্লান্ত লাগতে পারে, কিন্তু ফিনিশিং লাইনে পৌঁছানোর পর যে স্বাধীনতার স্বাদ আপনি পাবেন, তা অমূল্য।

আপনার ঋণের তালিকাটি আজই তৈরি করুন এবং ওপরের ৫টি পদ্ধতির মধ্যে যেকোনো একটি বেছে নিয়ে যুদ্ধে নেমে পড়ুন। শুভকামনা!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top