ইমার্জেন্সি ফান্ড: বিপদের দিনের প্রকৃত বন্ধু এবং আর্থিক স্বাধীনতার প্রথম ধাপ

জীবন অনিশ্চিত। আজ সব ঠিক আছে, কিন্তু কাল কী হবে কেউ জানে না। হঠাৎ চাকরি চলে যাওয়া, বড় কোনো অসুখ, বা বাড়িতে জরুরি মেরামতির প্রয়োজন—বিপদ কখনো বলে আসে না।

আর এই বিপদের সময় যদি আপনার হাতে পর্যাপ্ত টাকা না থাকে, তবে আপনাকে বাধ্য হয়ে ঋণ নিতে হয়, ক্রেডিট কার্ড ঘষতে হয় বা আপনার দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ (যেমন মিউচুয়াল ফান্ড বা সোনা) ভেঙে ফেলতে হয়। এর ফলে আপনার এতদিনের সাজানো আর্থিক পরিকল্পনা মুহূর্তেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে।

এই পরিস্থিতি থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হলো—“ইমার্জেন্সি ফান্ড” (Emergency Fund)

১. ইমার্জেন্সি ফান্ড কী?

সহজ কথায়, ইমার্জেন্সি ফান্ড হলো এমন একটি সঞ্চয়, যা আপনি শুধুমাত্র চরম বিপদের জন্য আলাদা করে রাখেন।

এটি নতুন ফোন কেনার জন্য নয়, ঘুরতে যাওয়ার জন্য নয়, বা শেয়ার বাজারে খাটানোর জন্য নয়। এটি শুধুমাত্র তখনই ব্যবহার করা হবে যখন আপনার আয়ের রাস্তা বন্ধ হয়ে যাবে বা এমন কোনো খরচ আসবে যা আপনি এড়াতে পারবেন না।

একে আপনার আর্থিক জীবনের “অক্সিজেন মাস্ক” বা “লাইফ জ্যাকেট” বলতে পারেন।

২. কেন এটি আপনার প্রথম বিনিয়োগ হওয়া উচিত?

অনেকেই ভুল করে প্রথমেই শেয়ার বাজার বা মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ শুরু করেন। কিন্তু ফিনান্সিয়াল প্ল্যানিং-এর সুবর্ণ নিয়ম হলো:

“আগে সুরক্ষা, তারপর বৃদ্ধি।”

ধরুন, আপনি শেয়ার বাজারে ১ লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করেছেন। হঠাৎ আপনার ২০,০০০ টাকার প্রয়োজন হলো। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তখন শেয়ার বাজার ডাউন এবং আপনার ১ লক্ষ টাকার ভ্যালু কমে ৮০,০০০ টাকা হয়ে আছে। আপনি যদি তখন টাকা তোলেন, তবে আপনার নিশ্চিত লোকসান হবে।

কিন্তু যদি আপনার একটি আলাদা ইমার্জেন্সি ফান্ড থাকত, তবে আপনাকে ওই বিনিয়োগে হাত দিতে হতো না।

৩. কত টাকা জমানো উচিত?

ইমার্জেন্সি ফান্ডের পরিমাণ সবার জন্য এক নয়। তবে একটি সাধারণ থাম্ব-রুল (Thumb Rule) হলো:

  • আপনার মাসিক খরচ (Monthly Expenses) x ৬ মাস

অর্থাৎ, যদি আপনার সংসার চালাতে মাসে ৩০,০০০ টাকা খরচ হয়, তবে আপনার ইমার্জেন্সি ফান্ডে অন্তত ১,৮০,০০০ টাকা (৩০,০০০ x ৬) থাকা উচিত।

কাদের কত প্রয়োজন?

  • অবিবাহিত ও চাকরিজীবী: অন্তত ৩ থেকে ৬ মাসের খরচ।
  • বিবাহিত ও সন্তান আছে: অন্তত ৬ থেকে ৯ মাসের খরচ।
  • ফ্রিল্যান্সার বা ব্যবসায়ী (যাদের আয় অনিশ্চিত): অন্তত ১২ মাসের খরচ।

এই টাকাটি আপনাকে চাকরি চলে গেলেও ৬ মাস বা ১ বছর নিশ্চিন্তে নতুন চাকরি খোঁজার সময় দেবে।

৪. এই টাকা কোথায় রাখবেন?

ইমার্জেন্সি ফান্ডের প্রধান শর্ত হলো “লিকুইডিটি” (Liquidity) বা সহজলভ্যতা। অর্থাৎ, রাত ২টোর সময়ও যদি টাকার দরকার হয়, আপনি যেন তা পেতে পারেন।

তাই এই টাকা কখনোই জমি, শেয়ার বাজার বা ৫ বছরের লক-ইন থাকা স্কিমে রাখবেন না।

সেরা জায়গা: ১. সেভিংস অ্যাকাউন্ট (Sweep-in FD সুবিধা সহ): যাতে দরকারের সময় এটিএম থেকে টাকা তোলা যায় এবং সুদও ভালো পাওয়া যায়। ২. লিকুইড মিউচুয়াল ফান্ড (Liquid Funds): এখানে সেভিংস অ্যাকাউন্টের চেয়ে একটু বেশি সুদ পাওয়া যায় এবং ১-২ দিনের মধ্যে টাকা ব্যাংকে চলে আসে।

পরামর্শ: মোট ইমার্জেন্সি ফান্ডের ২০% ক্যাশ বা সেভিংস অ্যাকাউন্টে রাখুন এবং বাকি ৮০% লিকুইড ফান্ড বা ফ্লেক্সি-ফিক্সড ডিপোজিটে রাখুন।

৫. ইমার্জেন্সি ফান্ড বনাম সাধারণ সঞ্চয়

বৈশিষ্ট্যইমার্জেন্সি ফান্ডসাধারণ সঞ্চয়
উদ্দেশ্যশুধু বিপদের জন্য (চাকরি হারানো, অসুস্থতা)শখ পূরণ (গাড়ি, বাড়ি, ভ্রমণ)
ব্যবহারযখন কোনো উপায় নেইপরিকল্পনামাফিক
বিনিয়োগঝুঁকিহীন এবং অতি-তরল (Liquid)শেয়ার, বন্ড বা মিউচুয়াল ফান্ড

শেষ কথা

ইমার্জেন্সি ফান্ড তৈরি করা হয়তো খুব রোমাঞ্চকর বা লাভজনক মনে হয় না, কারণ এটি আপনাকে শেয়ার বাজারের মতো ২০% রিটার্ন দেবে না। কিন্তু এটি আপনাকে যা দেবে তা অমূল্য—“মানসিক শান্তি” (Peace of Mind)

রাতের বেলা নিশ্চিন্তে ঘুমানোর চেয়ে বড় রিটার্ন আর কিছু হতে পারে না। তাই আজই হিসাব করুন আপনার কত টাকা প্রয়োজন এবং একটু একটু করে আপনার বিপদের ব

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top