১০ বছরে ১.২ কোটি টাকা? মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য CA-এর সহজ ফর্মুলা
মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য “কোটিপতি” হওয়া বা একটি বিশাল অঙ্কের সম্পদ তৈরি করা প্রায়শই একটি স্বপ্নের মতো মনে হয়। সীমিত আয় এবং ক্রমবর্ধমান খরচের চাপে, ১০ বছরে ১.২ কোটি টাকা জমানোর কথাটি অসম্ভব লাগতে পারে।
কিন্তু, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট (CA) নিতিন কৌশিকের মতে, এই লক্ষ্য অর্জন করা সম্পূর্ণ সম্ভব। এর জন্য আপনার আকাশছোঁয়া বেতনের প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন শুধু দুটি জিনিসের: শৃঙ্খলা এবং ধারাবাহিকতা।
নিতিন কৌশিক সম্প্রতি X (পূর্বে টুইটার) -এ একটি সহজ ফর্মুলা শেয়ার করেছেন, যা দেখায় যে সাধারণ আয়ের পরিবারগুলিও কীভাবে ঝুঁকিপূর্ণ শর্টকাট বা রাতারাতি বড়লোক হওয়ার ফাঁদ এড়িয়ে নিজেদের আর্থিক ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে পারে।
“Glance Today”-এর এই ব্লগে, আমরা সেই বাস্তবসম্মত এবং কার্যকরী পদক্ষেপগুলি নিয়ে আলোচনা করব, যা আপনাকে এই লক্ষ্যে পৌঁছাতে সাহায্য করতে পারে।
১. আর্থিক লক্ষ্যগুলিকে শুরুতেই অগ্রাধিকার দিন (সন্তানের ভবিষ্যৎ)
সম্পদ তৈরির প্রথম ধাপ হলো আপনার লক্ষ্যগুলি ঠিক করা। কৌশিক জোর দেন যে, পরিবারের ফোকাস যদি সন্তানের ভবিষ্যতের ওপর থাকে, তবে বিনিয়োগ শুরু করার সেরা সময় হলো সন্তানের জন্মের দিন থেকেই।
- পদ্ধতি: প্রতি মাসে প্রায় ১০,০০০ টাকা বিনিয়োগ করুন। এই টাকাটি দুটি ভাগে ভাগ করুন—একটি অংশ ইনডেক্স ফান্ডের SIP (Systematic Investment Plan)-এ এবং অন্য অংশটি পাবলিক প্রভিডেন্ট ফান্ড (PPF)-এ রাখুন।
- লক্ষ্য: এইভাবে ১৫ বছর ধরে বিনিয়োগ চালিয়ে গেলে, মিউচুয়াল ফান্ড থেকে আনুমানিক ১২% বার্ষিক রিটার্ন এবং PPF-এর সুরক্ষা ও ট্যাক্স সুবিধার মাধ্যমে প্রায় ৬০ লক্ষ টাকার একটি তহবিল তৈরি করা সম্ভব।
- কেন এটি কাজ করে: যত তাড়াতাড়ি আপনি শুরু করবেন, চক্রবৃদ্ধি সুদের (Power of Compounding) জাদু তত বেশি সময় ধরে কাজ করবে, যা আপনার সঞ্চয়কে বহুগুণ বাড়িয়ে তুলবে।
২. আর্থিক চাপ ছাড়াই নিজের বাড়ির স্বপ্ন পূরণ
নিজের বাড়ি থাকা বেশিরভাগ ভারতীয় পরিবারের প্রধান অগ্রাধিকার। কিন্তু CA কৌশিক পরামর্শ দেন যে, হোম লোন নেওয়ার জন্য তাড়াহুড়ো করা উচিত নয়।
- ভুল পদক্ষেপ: অনেকেই ২০ বা ৩০ বছরের দীর্ঘমেয়াদী লোন নিয়ে ফেলেন, যার ফলে বিপুল পরিমাণ সুদ গুনতে হয়।
- স্মার্ট পদক্ষেপ:
- আগে সঞ্চয়, পরে কেনা: প্রথমে কয়েক বছর ভাড়ায় থাকুন এবং সেই সময়ে aggressively সঞ্চয় করে বাড়ির মোট মূল্যের অন্তত ২৫% ডাউন পেমেন্ট হিসাবে জমা করুন।
- কম মেয়াদের লোন: ২০ বছরের লোনের বদলে ১০ বছরের মতো কম মেয়াদের লোন বেছে নিন।
- EMI নিয়ন্ত্রণ: আপনার মাসিক EMI (কিস্তি) যেন আপনার মোট আয়ের ৩৫% -এর বেশি না হয়।
- কেন এটি কাজ করে: এই সতর্ক পদ্ধতি আপনাকে ঋণের জালে জড়িয়ে পড়া থেকে বাঁচায়। কম সুদে এবং কম সময়ে লোন শোধ হয়ে যাওয়ায় আপনি দ্রুত ঋণমুক্ত হতে পারেন এবং মানসিক শান্তি পান।
৩. অবসরের প্রস্তুতি: শুধু EPF যথেষ্ট নয়
অনেক বেতনভোগী মানুষ মনে করেন যে তাদের এমপ্লয়িজ প্রভিডেন্ট ফান্ড (EPF)-এ যা জমা হচ্ছে, তা-ই অবসরের জন্য যথেষ্ট। কিন্তু মুদ্রাস্ফীতির (Inflation) যুগে এটি একটি মারাত্মক ভুল ধারণা হতে পারে।
- সতর্কতা: শুধুমাত্র EPF-এর ওপর নির্ভর করলে অবসরের সময় আপনার প্রয়োজনীয় তহবিলের ঘাটতি হতে পারে।
- সঠিক পরিকল্পনা: কৌশিকের মতে, স্মার্ট বিনিয়োগকারীরা EPF-এর পাশাপাশি ন্যাশনাল পেনশন সিস্টেম (NPS)-এ নিয়মিত অবদান বাড়াতে থাকেন এবং একটি আলাদা রিটায়ারমেন্ট SIP চালু রাখেন।
- লক্ষ্য: এই বৈচিত্র্যময় পদ্ধতির মাধ্যমে আগামী ১০ বছরের মধ্যে ৩০-৩৫ লক্ষ টাকার একটি পৃথক অবসর তহবিল (Retirement Corpus) তৈরির লক্ষ্য রাখুন।
- কেন এটি কাজ করে: এই অতিরিক্ত সঞ্চয় আপনাকে ভবিষ্যতের মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকি থেকে রক্ষা করে এবং EPF-এর বাইরেও একটি সুরক্ষিত আর্থিক ভিত্তি প্রদান করে।
৪. আসল রহস্য: সাধারণ অভ্যাস (যা তফাৎ গড়ে দেয়)
বিশাল বেতন বা জটিল বিনিয়োগের চেয়েও, সাধারণ কিছু অভ্যাসই সম্পদ তৈরির পথে আসল তফাৎ গড়ে দেয়।
- লাইফস্টাইল ইনফ্লেশন এড়িয়ে চলুন: আয় বাড়ার সাথে সাথেই জীবনযাত্রার মান বাড়িয়ে ফেলবেন না (Lifestyle Inflation)। বেতন বাড়লে, আপনার বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়ান, খরচ নয়।
- খরচের হিসাব রাখুন: একটি সাধারণ এক্সেল স্প্রেডশিট (Excel Spreadsheet) ব্যবহার করে আপনার মাসিক খরচের হিসাব রাখুন। এটি আপনাকে অপ্রয়োজনীয় খরচ খুঁজে বের করতে সাহায্য করবে।
- বড় খরচ পিছিয়ে দিন: সঞ্চয়ের লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত দামী ছুটি বা অপ্রয়োজনীয় গ্যাজেট কেনা থেকে বিরত থাকুন।
- ছোট ছোট জয় উদযাপন করুন: যখন আপনার SIP-এর পরিমাণ ৫ লক্ষ টাকায় পৌঁছাবে বা আপনি লোনের একটি বড় অংশ প্রিপেমেন্ট করবেন, তখন তা উদযাপন করুন। এটি আপনাকে দীর্ঘমেয়াদে অনুপ্রাণিত (motivated) রাখবে।
শেষ কথা: ফর্মুলাটি সহজ, প্রয়োজন শুধু শৃঙ্খলার
CA নিতিন কৌশিকের এই পরামর্শগুলি প্রমাণ করে যে, সম্পদ তৈরি করা কোনো “রকেট সায়েন্স” নয়। এটি ধনী হওয়ার কোনো গোপন শর্টকাটও নয়।
এটি হলো প্রতিদিন ছোট ছোট, শৃঙ্খলাবদ্ধ আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার একটি ফল। ১০ বছরে ১.২ কোটি টাকার লক্ষ্যে পৌঁছানো অবশ্যই সম্ভব, যদি আপনি একটি স্পষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে পারেন।
এই সমস্ত লক্ষ্যগুলি (সন্তানের পড়াশোনা, অবসর, বাড়ির ডাউন পেমেন্ট) পূরণের জন্য আপনাকে যদি সব মিলিয়ে প্রতি মাসে প্রায় ৫০,০০০ থেকে ৫২,০০০ টাকা একটি সুশৃঙ্খল SIP-এর মাধ্যমে বিনিয়োগ করতে হয়, তবে চক্রবৃদ্ধি সুদের মাধ্যমে এই বিশাল অঙ্ক অর্জন করা সম্পূর্ণ বাস্তবসম্মত।
আপনার আয় যাই হোক না কেন, আজই শুরু করুন এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, ধারাবাহিকতা বজায় রাখুন।







