চক্রবৃদ্ধি সুদের (Power of Compounding) জাদু: অ্যালবার্ট আইনস্টাইন কেন একে “বিশ্বের অষ্টম আশ্চর্য” বলেছেন?

​কথিত আছে, প্রখ্যাত বিজ্ঞানী অ্যালবার্ট আইনস্টাইন একবার বলেছিলেন, “চক্রবৃদ্ধি সুদ (Compound Interest) হলো বিশ্বের অষ্টম আশ্চর্য। যে এটি বোঝে, সে এটি অর্জন করে… যে বোঝে না, সে এটি প্রদান করে।”

​একটি সায়েন্টিস্টের মুখ থেকে টাকা-পয়সার এমন একটি নিয়মকে “আশ্চর্য” বলে ঘোষণা করাটা বেশ অবাক করার মতো। কিন্তু কেন?

​একটি সাধারণ গাণিতিক সূত্র কীভাবে এত শক্তিশালী হতে পারে?

​”Glance Today”-এর এই ব্লগে আমরা সেই জাদুর উন্মোচন করব। আমরা দেখব কেন চক্রবৃদ্ধি সুদকে আপনার আর্থিক জীবনের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার বলা হয় এবং কীভাবে এই “অষ্টম আশ্চর্য” আপনাকে কোনো অতিরিক্ত পরিশ্রম ছাড়াই ধনী বানাতে পারে।

​চক্রবৃদ্ধি সুদ আসলে কী? (একটি সহজ গল্প)

​এই “জাদু” বোঝার আগে, আসুন এর ঠিক উল্টো, অর্থাৎ সরল সুদ (Simple Interest) কী তা বুঝি।

সরল সুদ: ধরুন, আপনি ব্যাঙ্কে ১,০০০ টাকা রাখলেন এবং ব্যাঙ্ক আপনাকে বছরে ১০% সরল সুদ দেয়। এর মানে হলো, প্রতি বছর আপনি আপনার আসল (Principal) ১,০০০ টাকার ওপর ১০% বা ১০০ টাকা করে সুদ পাবেন। ৫ বছর পর আপনার কাছে থাকবে (১,০০০ আসল + ৫০০ সুদ) = ১,৫০০ টাকা। এখানে আপনার সুদ কখনোই বাড়ে না।

এবার আসুন “অষ্টম আশ্চর্য”-এর কাছে।

চক্রবৃদ্ধি সুদ (Compound Interest): একে বলা হয় “সুদের ওপর সুদ”।

​ধরুন, আপনি সেই ১,০০০ টাকাই এমন এক জায়গায় রাখলেন যেখানে ১০% চক্রবৃদ্ধি সুদ দেয়।

  • ১ম বছর: আপনি আসলের (১,০০০) ওপর ১০% সুদ পেলেন = ১০০ টাকা। আপনার মোট জমল ১,১০০ টাকা।
  • ২য় বছর (এখানেই জাদু শুরু): আপনি এখন আপনার আসলের (১,০০০) ওপর সুদ পাবেন না। আপনি সুদ পাবেন আপনার নতুন জমার (১,১০০) ওপর।
    • ​১,১০০ টাকার ১০% = ১১০ টাকা।
    • ​দেখুন, এই বছর আপনি ১০ টাকা বেশি সুদ পেলেন। কেন? কারণ আপনি আপনার গত বছরের সুদ (১০০ টাকা) -এর ওপরও ১০% সুদ (১০ টাকা) পেয়েছেন।
  • ৩য় বছর: আপনার মোট জমা হলো (১,১০০ + ১১০) = ১,২১০ টাকা। এই বছর আপনি ১,২১০ টাকার ওপর ১০% সুদ পাবেন = ১২১ টাকা।
  • ৪র্থ বছর: জমা হলো (১,২১০ + ১২১) = ১,৩৩১ টাকা। এর ওপর ১০% সুদ = ১৩৩.১ টাকা।

​দেখতে পাচ্ছেন? প্রতি বছর আপনার সুদের পরিমাণ বাড়ছে। কারণ আপনার সুদ নিজেও আপনার হয়ে “কাজ” করছে এবং নতুন সুদ “আয়” করছে।

​কেন এটি এত শক্তিশালী? “সময়” হলো এর আসল জ্বালানি

​চক্রবৃদ্ধি সুদের আসল শক্তিটি লুকিয়ে আছে “সময়” (Time)-এর মধ্যে। প্রথম কয়েক বছর এর বৃদ্ধি খুব ধীর মনে হয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর বৃদ্ধি রকেটের গতিতে হয়।

​আসুন দুই বন্ধুর গল্প শুনি: অমিত (তাড়াতাড়ি শুরু) বনাম সুমিত (দেরিতে শুরু)

​দুজনই প্রতি মাসে ৫,০০০ টাকা করে একটি মিউচুয়াল ফান্ডে (SIP) বিনিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নিলো, যেখানে তারা বার্ষিক গড়ে ১২% রিটার্ন আশা করে।

১. অমিত (The Early Starter):

  • বয়স: ২৫ বছর
  • বিনিয়োগের সময়কাল: মাত্র ১০ বছর (অর্থাৎ ৩৫ বছর বয়স পর্যন্ত)।
  • মোট বিনিয়োগ: (৫,০০০ টাকা x ১২ মাস x ১০ বছর) = ৬,০০,০০০ টাকা।
  • ​৩৫ বছর বয়সে বিনিয়োগ বন্ধ করে সে টাকাটা শুধু বাড়তে দিল।

২. সুমিত (The Late Starter):

  • বয়স: ৩৫ বছর (অমিত যখন বন্ধ করল)
  • বিনিয়োগের সময়কাল: ২৫ বছর (অর্থাৎ ৬০ বছর বয়স পর্যন্ত)।
  • মোট বিনিয়োগ: (৫,০০০ টাকা x ১২ মাস x ২৫ বছর) = ১৫,০০,০০০ টাকা।

ফলাফল (যখন দুজনেরই বয়স ৬০):

  • সুমিত: ২৫ বছর ধরে মোট ১৫ লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করে ৬০ বছর বয়সে জমিয়েছে প্রায় ৯৫ লক্ষ টাকা। (চমৎকার!)
  • অমিত: মাত্র ১০ বছর বিনিয়োগ করে (৬ লক্ষ টাকা) এবং তারপর আর একটি টাকাও না দিয়ে, ৬০ বছর বয়সে জমিয়েছে প্রায় ১ কোটি ৮৮ লক্ষ টাকা!

একবার ভাবুন!

​সুমিত, অমিতের চেয়ে ২.৫ গুণ বেশি টাকা বিনিয়োগ করেও অমিতের জমানো টাকার প্রায় অর্ধেক জমিয়েছে।

কেন?

কারণ অমিতের টাকা চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়ার জন্য ৩৫ বছর (২৫ থেকে ৬০) সময় পেয়েছে, যেখানে সুমিতের টাকা সময় পেয়েছে মাত্র ২৫ বছর

​অমিতের প্রথম ১০ বছরের জমানো ৬ লক্ষ টাকাই তার হয়ে বাকি ২৫ বছর ধরে “কাজ” করেছে। এটাই হলো চক্রবৃদ্ধি সুদের আসল জাদু। আপনি কত টাকা বিনিয়োগ করছেন তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো আপনি কত সময় ধরে বিনিয়োগ করছেন।

​আইনস্টাইনের সেই কথার আসল অর্থ: “অর্জন” বনাম “প্রদান”

​আইনস্টাইন বলেছিলেন, “যে এটি বোঝে, সে এটি অর্জন করে… যে বোঝে না, সে এটি প্রদান করে।”

​১. কীভাবে আপনি এটি “অর্জন” করবেন?

  • মিউচুয়াল ফান্ড (SIP): এটি চক্রবৃদ্ধি সুদের সুবিধা নেওয়ার সেরা এবং সহজতম উপায়।
  • পাবলিক প্রভিডেন্ট ফান্ড (PPF): এখানেও আপনার টাকা চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়ে।
  • ভালো কোম্পানির স্টক: ভালো কোম্পানিগুলো লাভ করলে তা আবার নতুন করে বিনিয়োগ করে (Re-invest), যার ফলে তাদের শেয়ারের দাম চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়ে।
  • ফিক্সড ডিপোজিট (FD): এখানেও চক্রবৃদ্ধি হয়, তবে সুদের হার সাধারণত মুদ্রাস্ফীতিকে হারাতে পারে না।

​২. কীভাবে আপনি এটি “প্রদান” করছেন? (সবচেয়ে ভয়ঙ্কর)

​চক্রবৃদ্ধি সুদের একটি অন্ধকার দিকও আছে। এটি আপনার বিরুদ্ধেও কাজ করতে পারে।

উদাহরণ: ক্রেডিট কার্ডের বিল

​ধরুন, আপনি ক্রেডিট কার্ডে ৫০,০০০ টাকা খরচ করেছেন এবং সময়মতো বিল দেননি। ব্যাঙ্ক আপনার ওপর বার্ষিক ৩৬% (বা মাসিক ৩%) চক্রবৃদ্ধি সুদ চাপানো শুরু করল।

  • ১ম মাস: ৫০,০০০ টাকার ওপর ৩% সুদ = ১,৫০০ টাকা। মোট দেনা = ৫১,৫০০ টাকা।
  • ২য় মাস: আপনি বিল দেননি। ব্যাঙ্ক এখন আপনার নতুন দেনা (৫১,৫০০) -এর ওপর ৩% সুদ নেবে = ১,৫৪৫ টাকা। মোট দেনা = ৫৩,০৪৫ টাকা।

​দেখুন, আপনার দেনা এখন তুষার বলের মতো বাড়ছে (Snowball effect)। আপনি “সুদের ওপর সুদ” প্রদান করছেন। পার্সোনাল লোন, বা যেকোনো ধরনের ঋণ যেখানে চক্রবৃদ্ধি সুদ কাজ করে, তা আপনাকে দ্রুত ঋণের জালে আটকে ফেলতে পারে।

​শেষ কথা: আজই শুরু করুন

​চক্রবৃদ্ধি সুদের এই “অষ্টম আশ্চর্য”-এর সুবিধা নেওয়ার জন্য আপনাকে ধনী হতে হবে না বা রকেট সায়েন্টিস্ট হতে হবে না। আপনার শুধু দুটি জিনিস দরকার: শৃঙ্খলা এবং সময়

​আপনি যত তাড়াতাড়ি শুরু করবেন, সময় তত বেশি আপনার পক্ষে কাজ করবে।

​তাই, আপনার বয়স ২৫ হোক বা ৩৫, ভাববেন না যে “আরেকটু পরে শুরু করব”। আপনার জমানো প্রথম ১,০০০ টাকাই হোক না কেন, তাকে আজই কাজে লাগিয়ে দিন।

​কারণ, বিনিয়োগ শুরু করার সেরা সময় ছিল গতকাল। দ্বিতীয় সেরা সময় হলো আজ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top